স্পোর্টস ডেস্ক : তার চুলের তুলনা হচ্ছিল কিংবদন্তি গায়ক বব মার্লির সঙ্গে। তবে গিটার নয়, হাতে ছিল টেনিস র্যাকেট। যার আঘাতে ঘায়েল ১০ নম্বর বাছাই রাফায়েল নাদাল। জার্মানির ডাস্টিন ব্রাউনই ঘটালেন আপাতত এই উইম্বলডনের সবচেয়ে বড় অঘটন। নাদাল হেরে গেলেন ৫-৭ , ৬-৩ , ৪-৬, ৪-৬ সেটে।
বিপদের গন্ধটা কি তিনি চব্বিশ ঘণ্টা আগেই পেয়েছিলেন? দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রতিপক্ষের নাম ডাস্টিন ব্রাউন জানতে পেরেই রাফায়েল নাদাল বলেছিলেন, ‘খুব বিপজ্জনক ম্যাচ হতে চলেছে। ও যে কখন কী করে দেবে কেউ জানে না। খুব অন্য ধরনের টেনিস খেলে। গত বছর হ্যাল-এ আমাকে হারিয়েছে। ম্যাচ কোন দিকে গড়াবে বলা কঠিন। তবে এবার আমি ওর জন্য তৈরি থাকার চেষ্টা করব।’
বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় রাউন্ডে কিন্তু ব্রাউন নামক ঝড়ের মোকাবিলায় একদম অসহায় দেখাল বিশ্বের সাবেক এক নম্বরকে। এবারের উইম্বলডনের সবচেয়ে বড় অঘটনটা ঘটিয়ে যাঁকে ছিটকে দিলেন তিরিশ বছরের জার্মান তরুণ ডাস্টিন ব্রাউন।
ম্যাচের শুরু থেকেই কোর্টে নাদালকে কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন দৈত্যাকার ব্রাউন। তার বিদ্যুৎগতির নড়াচড়া আর শক্তিশালী সার্ভ সামলাতে হিমশিম খাওয়া নাদালকে রীতিমতো অসহায় দেখায়। বস্তুত যে নাদালকে বিশ্ব চেনে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত আর গুটিয়ে থাকা এক প্লেয়ারকে আজ দেখা গেল কোর্টে। ব্রাউন ঠিক যতটা আগ্রাসী আর আক্রমণাত্মক খেললেন, ততটাই যেন আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগলেন নাদাল। সবচেয়ে বড় কথা, বড় পয়েন্টগুলোয় মরিয়া লড়াইটাই দেখা গেল না তার কাছে।
নাদাল-বধের পর উচ্ছ্বসিত ব্রাউন বলেন, ‘উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে যে কখনও খেলব সেটাই ভাবিনি। ভেবেছিলাম আজ নেমে গুটিয়ে যাব। কিন্তু খেলতে গিয়ে মনে হল এটা খুব চেনা জায়গা।’ তিনি যে জেতার ছক কষেই নেমেছিলেন, বুঝিয়ে ব্রাউন বলেন, ‘আমার আজ একটাই প্ল্যান ছিল। দারুণ টেনিস খেলা। তাই রাত ন’টার পরেও খেলা গড়াবে, সেই চিন্তা মনেও আনিনি।’
অন্য দিকে, নাদালের ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এর পর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ড কোর্টে আর কি তিনি সুবিধা করতে পারবেন? তার পায়ে যে ধরনের চোট তাতে হার্ড কোর্টে তো গত বছর খেলেনইনি। এ বছরও সেই রাস্তায় হাটেন কি না, সেটাই দেখার।
গত চার বছরের নিরিখে ছবিটা যদিও আর নতুন নয়। সেই হার একশোর পিছনের র্যাংকের খেলোয়াড়ের কাছে। ২০১১ সালে রানার্সআপ হওয়ার পর নাদালের উইম্বলডন অভিযানের পরিসর অল্পই। কখনও প্রথম রাউন্ড, কখনও দ্বিতীয়। গতবার পৌঁছে ছিলেন চতুর্থ রাউন্ডে। অ্যান্ডি মারে, রজার ফেদেরারের সহজেই তৃতীয় রাউন্ডে পৌঁছনোর দিন তারকা খসে পড়ল উইম্বলডন থেকে।
২০০৪ সালে নাদাল প্রথম ফরাসি ওপেন জেতার আগের বছর কোনও গ্র্যান্ড স্লাম জেতেননি। ১১ বছর পর সেই সম্ভাবনা ফের চাগিয়ে উঠছে। সামনে বাকি শুধু ইউএস ওপেন। এদিন উইম্বলডনে প্রথম সেটটাই নাদাল হেরে বসেন ব্রাউনের কাছে। দ্বিতীয় সেটে ফিরে এলেও পরের দু’টো সেটে সহজেই নাদালের সার্ভিস ব্রেক করে দেন ব্রাউন।
ম্যাচের পর তার হতাশ মুখের সঙ্গে কত তফাৎ কয়েক ঘণ্টা আগে ফেদেরারের হাসিমাখা মুখের! যিনি জয়ের পর হেয়ারব্যান্ড ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন গ্যালারির দিকে। দ্বিতীয় বাছাই হলে কী হবে, উইম্বলডনে বরাবরই অন্যরকম ফেদেরার। ঘাসের কোর্টে এখনও ভয়ঙ্কর। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন স্যাম। ৬-৪, ৬-২, ৬-২ জিতলেন সুইত্জারল্যান্ডের তারকা।
জেতার পাশাপাশি পায়ের নীচ দিয়ে টুইনার শটে গ্যালারি মাতালেন ফেদেরার। এমনিতে নাদাল-পতন ছাড়া এ দিনটা উইম্বলডনে সব দিক থেকেই স্বাভাবিক। প্রথমত বুধবারের মতো দাবদাহ ছিল না। আর এদিন পুরুষ থেকে মেয়ে, সব তারকা সহজেই এগোলেন।
ফেদেরারের মতো মেজাজে ছিলেন টুর্নামেন্টের তৃতীয় বাছাই অ্যান্ডি মারে। তার শেষ বড় সাফল্য বলতে ২০১৩ সালের উইম্বলডন জয়। এরপর আর কোনও গ্র্যান্ড স্লাম নেই। আবার কি উইম্বলডন জিতেই সেই খরা কাটাবেন অ্যান্ডি মারে? জবাব মিলতে সময় লাগলেও অল ইংল্যান্ড ক্লাবে মারে যে ছন্দে আছে সেটা বলেই দেওয়া যায়।
মেজাজে থেকেই বৃহস্পতিবার তৃতীয় বাছাই মারে পৌঁছলেন তৃতীয় রাউন্ডে। সরাসরি সেটে উড়িয়ে দিলেন ৭৮তম বাছাই নেদারল্যান্ডসের রবিন হাসকে। ফল মারের পক্ষে ৬-১, ৬-১, ৬-৪ সেট।
সোজা কথায় ডাচ প্রতিপক্ষকে মাথা তোলার কোনও সুযোগই দেননি মারে। দুরন্ত গতিতে শুরু করেই সাফল্য ম্যাচের পর সে কথা জানাতে ভোলেননি গ্রেট ব্রিটেনের তারকা। বলেছেন, ‘আসলে আমি ম্যাচের শুরুটাই খুব ভালো করেছিলাম। বেশ গতি নিয়েই খেলা শুরু করি, তুলনায় রবিন একটু স্লো খেলছিল। অবশ্য পরে ও ভালো টেনিস খেলছিল।’ যদিও ভালো টেনিস খেললেও মারেকে বেকায়দায় ফেলার মতো পরিস্থিতি কখনওই তৈরি করতে পারেননি রবিন।
মেয়েদের সিঙ্গলসেও মসৃণভাবেই দ্বিতীয় রাউন্ডের বেড়া টপকেছেন ক্যারোলিন ওজনিয়াকি, পেত্রা কেভিতোভা, লিসিকি, রাদওয়ানস্কারা। পঞ্চম বাছাই ডেনমার্কের ওজনিয়াকি ৬-১, ৭ -৬ (৮ -৬) হারালেন চেক তরুণী ডেনিসা আলারতোভাকে।
এ দিকে চ্যাম্পিয়নের মতোই দেখাচ্ছে আর এক চেক তরুণী, গতবারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন পেত্রা কেভিতোভাকে। তার সামনে লড়াইয়ের সুযোগই পাননি জাপানের কুরুমি নারা। ফল কেভিতোভার পক্ষে ৬-২, ৬-০। রাদওয়ানস্কা একই ভাবে স্ট্রেট সেটে জিতেই পা রাখলেন তৃতীয় রাউন্ডে। মেয়েদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় লড়ই করে জিততে হল লিসিকিকে। ম্যাক হেলের কাছে প্রথম সেট হেরে চাপে পড়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ২-৬, ৭ -৫ , ৬-১ ম্যাচ ছিনিয়ে নেন তিনি।

