নিজস্ব প্রতিবেদক : বঙ্গোপসাগরে তিন ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে মার্কিন কোম্পানি কনোকো-ফিলিপস। তবে তাদের অংশীদার নরওয়েভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি স্টেটঅয়েল এককভাবে কাজ করতে আগ্রহী। তবে সংস্থাটি উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে (পিএসসি) কিছু পরিবরর্তন চায়। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েছে স্টেটঅয়েল।
পিএসসি ২০১২-এর আওতায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। একমাত্র দরদাতা হিসেবে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ এই তিন ব্লকের জন্য যৌথভাবে দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছিল কনোকো ও স্টেট ওয়েল। তবে সরকার তিনটি নয়, দুটি ব্লক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু কোম্পানি দুটি এতে রাজি হয়নি। তারা তিন ব্লক দাবি করে। পরে সরকার তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে। কোম্পানি দুটি এই তিন ব্লকের অনুসন্ধান কাজে ৩২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পায়। কিন্তু পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিলে কনোকো বাংলাদেশ সরকারকে জানায়, তারা এ তিন ব্লকে কাজ করবে না। স্টেট অয়েলকে ব্লক তিনটি দিতে তারা সরকারকে অনুরোধ করে।
জ্বালানি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দরপত্রের শর্তানুযায়ী কারিগরী ও আর্থিকভাবে স্টেটঅয়েল যোগ্য। তবে এককভাবে শতভাগ শেয়ারের অংশীদার হিসেবে চুক্তি করতে হলে আইনি মতামত নিতে হবে। ইতোমধ্যেই বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
গভীর সমুদ্রের তিনটি ব্লকে চুক্তি করতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। দ্রুত চুক্তি করতে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হচ্ছে। জানা যায়, উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) ২০০৮-এ অংশ নিয়ে ২০১১ সালের ১৬ জুন সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। তবে দাবি পূরণ না হওয়ায় গত বছর এ দুটি ব্লক ছেড়ে দেয় কনোকো।
জ্বালানি বিভাগে পাঠানো চিঠিতে স্টেট অয়েল জানিয়েছে, আর্ন্তজাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিদ্যমান পিএসিসির শর্তাদি মেনে মুনাফা করা সম্ভব নয়। তাই পিএসসি স্বাক্ষরের পর থেকেই গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, স্টেটঅয়েলের শর্ত মেনে চুক্তি করতে হলে পিএসসি-২০১২ সংশোধন করতে হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শর্ত সংশোধন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে ইতোমধ্যেই পিএসসি-২০১২ একদফা সংশোধন করা হয়েছে। এতে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের পর থেকে প্রতি বছর ২ শতাংশ হারে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ রাখা আছে। ঠিকাদারের প্রাপ্ত অংশের ৫০ শতাংশ গ্যাস পেট্রোবাংলার অনুমতি ছাড়া দেশের বাজারে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা যাবে। ঠিকাদারের করপোরেট ট্যাক্স মওকুফ, বছরে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কস্ট রিকোভারি ও পাইপলাইন ব্যবহারের উপর ট্যারিফ প্রদান থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কনোকো-ফিলিপস বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যাপক আগ্রহ দেখালেও পরে তারা সরে গেছে। এছাড়া ব্লক তিনটি বহুমাত্রিক জরিপের (মাল্টিক্লেইন সার্ভে) আওতায় রাখা হয়নি। তাই এখন স্টেট অয়েলের চুক্তি না হলে এ তিন ব্লক সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যাবে না। এমনকি এ তিন ব্লকের অনুসন্ধান কার্যক্রম তিন বছরের মতো পিছিয়ে যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা চাইছে স্টেটঅয়েল। তবে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
প্রসঙ্গত, সমুদ্রের তলদেশে খনিজ সম্পদের অবস্থান, মজুদের পরিমাণ জানতে একটি বহুমাত্রিক জরিপ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রও ডাকা হয়েছে। জরিপের পর দরপত্রের মাধ্যমে আগ্রহী কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি করা হবে।
পিএসসি ২০০৮-এর আওতায় গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের জন্য কনোকোর সঙ্গে ২০১১ সালে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। তারা এখানে জরিপও পরিচালনা করে। চুক্তি অনুসারে এ দুই ব্লকে প্রতি ইউনিটের (এক হাজার ঘনফুট) গ্যাসের দাম রাখা হয় ৪ দশমিক ২ ডলার। কিন্তু কনোকো আরো বেশি দাম দাবি করে। সরকার তাতে সাড়া না দেয়ায় সম্প্রতি ব্লক দুটিও ছেড়ে দেয় কনোকো।

