‘হে নূতন,
দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।
তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন
সূর্যের মতন।
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ’
(পঁচিশে বৈশাখ; পূরবী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কাব্যমালায় এভাবেই নিজের আর্বিভাবকে জানিয়েছিলেন কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার আগে, পরে- কেউই এভাবেই নিজেকে কিংবা নিজের আগমনকে উপলব্ধি করতে পারেননি। তিনি শুধু নিজেকেই নয় প্রত্যেক বাঙালির আত্মউন্মোচন করেছিলেন কাব্যছন্দে, সুরের মালায় আর সরল লেখনী দিয়ে। মানবিক জীবনের প্রত্যেক অনুভূতিতেই তিনি নিজেকে আবৃষ্ট করে রেখেছেন।
আজ শুক্রবার, পঁচিশে বৈশাখ। আলোকের ঝরণাধারায় সৃজনশীলতার বিষ্ময়কর মহামানব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবগাহনের দিন। তার ১৫৪তম জন্মজয়ন্তী। তার জন্ম হয়েছিল কলকাতার বিখ্যাত জমিদার ঠাকুরবাড়ীর চৌকাঠে। কিন্তু পরিবারের ঐহিত্য তাকে ছুঁতে পারেনি। তিনি জমিদার নয়, হয়েছিলেন সৃজনের অধিকারী। মহামানব শুধু সাহিত্যচর্চাতেই নিজেকে বদ্ধ করেননি। প্রজাপ্রিয় এই মানুষটি নিজের সব অর্জন বিলিয়ে দিয়েছিলেন প্রজাদের মাঝে।
আজ এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যাচ্ছে রাষ্ট্র। গুম-অপহরণ আর হত্যার মহাউৎসবের মাঝে কবিগুরুর অমোঘ বাণী আজ ডাক দিচ্ছে মানবতার। কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে চলার। আর তাতেই সমৃদ্ধ হবে মানুষ; সমৃদ্ধ হবে রাষ্ট্র। আশার এ বাণী নিয়ে জাতি আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গান, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। কবির সেই আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিধ্বনি করেই বলতে হবে- ‘ওই মহামানব আসে।/দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে…’।
১২৬৮ বঙ্গাব্দে কলকাতার বিখ্যাত জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদা দেবীর কোল আলোকিত করে মর্তলোকে এসেছিলেন ‘সাহিত্যের অবতার’। সেদিনের সে আলোকচ্ছটায় আজও পুরো বিশ্ব আলোকিত। কবির ভাষায় বললে, ‘আকাশভরা সূর্যতারা/বিশ্বভরা প্রাণ…’। সেই বিশ্বভরা প্রাণের উচ্ছ্বাসে আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই ঋষি কবিকে, যার বাণীর ঐশ্বর্যে, ভাষার নৈপুণ্যে আর মানবিক মাঙ্গলিকতার বোধে আলোকিত আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলো।
পিতা-মাতার কনিষ্টতম সন্তানটি বাংলা কবিতাকে দিয়েছিলেন নতুন ভাষা আর বিষয়। বাংলা উপন্যাস, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, চিন্তনের নানা বিষয়ের অসংখ্য প্রবন্ধে তিনি আলোকপাত করেছেন শিক্ষার কথা, বিজ্ঞানের কথা, রাষ্ট্র আর সমাজের কল্যাণের কথা, মানবিক মূল্যবোধের কথা, সাহিত্য-দর্শন, চিত্রকলার কথা কতভাবেই না শুনিয়েছেন বাঙালিকে! সেই বিচিত্র প্রবন্ধরাজি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশাল ভুবন, যার অধীশ্বর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। তিনি ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। আজও অব্দি সাহিত্য ক্ষেত্রে আর কোনো বাঙালি মানবের সে সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি।
শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যেই ছিল না রবীন্দ্রনাথের বিচরণ ভূমি। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে মহাজনের চড়া সুদ আর ঋণ থেকে পূর্ব বাংলার গরিব কৃষককে বাঁচাতে ক্ষুদ্রঋণের জন্য কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসা, পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ শাসকদের নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে ব্রিটিশ রানী কর্তৃক প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করাসহ কত ক্ষেত্রেই না সাধারণ মানুষের কাতারে বারবার এসে দাঁড়িয়েছেন সমাজসচেতন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ দেববিগ্রহের পরিবর্তে কর্মী অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেছিলেন। সঙ্গীত ও নৃত্যকে তিনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন।
কবিগুরুর সাহিত্যকর্মে মহাকবি কালিদাস, ফকির লালন সাঁই, গগন হরকরা, হাফিজ, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, উইলিয়াম শেকসপিয়র ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব নজরে পড়ে। কবিগুরুর সাহিত্যের প্রভাব পড়ে কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, দত্তাত্রেয় রামচন্দ্র বেন্দ্রে, আন্দ্রে জিদ্, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, কুভেম্পু, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, পাবলো নেরুদা ও অক্টাভিও পাজের মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের রচনায়। তিনি একমাত্র গীতিকবি যার দুইটি গান ভিন্ন দুইটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হয়। তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’- গান দুইটি যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত।
কবিগুরু আমাদের দিয়েছেন কথা, সুন্দর দেখার দৃষ্টি ও জন্মভূমিকে ভালোবাসার বোধ। আপন মহিমায় আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কেমন করে বাসনা করতে হয় লালন, আশায় বাঁধতে হয় বুক এবং মানুষ ও প্রকৃতিকে করতে হয় আপন। কল্পনার প্রজ্ঞা দিয়েছেন, দিয়েছেন সৃষ্টির প্রেরণা। আর এসবের সঙ্গে রয়েছে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের বন্দনা বাণী। বস্তুত এজন্যই তিনি চিরদিন আমাদের লোক। যাকে আমরা খুঁজে পাই আনন্দের বারতায়, দুঃখের যাতনায়। খুঁজে পাই প্রেম-ভালোবাসায়, প্রতিবাদের ভাষায় আর দেশমাতৃকার জন্য আপনাকে উৎসর্গ করার ব্রত বোধে। আর তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরা আজ বলতে পারি- ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমায় পরে ঠেকায় মাথা’।
এদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

