ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঝালকাঠির কোনো কোনো স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ১৩টি পর্যন্ত পাঠ্যবই পড়ানো হচ্ছে। আর নার্সারি ক্লাসে রয়েছে আট বা তারও অধিক পাঠ্যবই। বিপুল পাঠ্যবই আর ঘন ঘন পরীক্ষার চাপে পিষ্ট হচ্ছে শিশুরা। ছেলেমেয়েদের পড়ার চাপ সামলাতে দিশেহারা অভিভাবক। অধিক পড়া আয়ত্ত করতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে তারা।
শহরের পার কিফাইতনগর এলাকার আনজুমান তার পাঁচ বছরের মেয়েকে ইংলিশ ভার্সনের একটি স্কুলে পড়ান। মাহমুদা খানম জানান, তার মেয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে এবং তার মোট ১৩টি পাঠ্যবই রয়েছে। বাংলা, অঙ্ক এবং ইংরেজি এ তিনটি সরকারি পাঠ্যবই। এ তিনটি বই ছাড়া ওই স্কুল থেকে আরো অতিরিক্ত ৯টি বই সংযুক্ত করা হয়েছে প্রথম শ্রেণীতেই। এগুলো হলো- ধর্ম, ভূগোল, চিত্রাঙ্কন, স্পোকেন ইংলিশ, কম্পিউটার, গেম, রেডিয়ান্ট রিডিং, বাংলা ব্যাকরণ, নামতা এবং মেন্টাল অ্যারিথমেটিক।
আনজুমান জানান, তার মেয়েকে তিনিই পড়ান। এতগুলো পাঠ্যবই নিয়ে প্রচণ্ড হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্কুল এবং স্কুলের বাইরে বাসায় বসে দিন-রাত পড়াশোনা ছাড়া আর কোনো কিছু করার সুযোগ নেই তার এবং তার মেয়ের। স্কুল থেকে বাসায় এলে হোমওয়ার্ক এবং পড়া তৈরি করতে দিন পার হয়ে যায়। সন্ধ্যার পরও বসতে হয় পড়ার জন্য। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরীক্ষা। দুই দিন পরপর ক্লাস টেস্ট, মডেল টেস্ট হয়। পরীক্ষার কারণে সবসময় শিশুদের পড়ার মধ্যে আটকে রাখতে হয়। তারপর আছে পরীক্ষায় ভালো করার তীব্র প্রতিযোগিতা।
রফিক সাহেবের পাঁচ বছরের মেয়ে একটি স্কুলে নার্সারি ক্লাসে পড়ে। ফাইজুল ইসলাম জানান, তার মেয়ের আটটি পাঠ্যবই রয়েছে। এগুলো হলো- বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, ধর্ম, চিত্রাঙ্কন, ওয়ার্ড মিনিং ও ধর্ম শিক্ষা।
তিনি বলেন, ‘তার আরেকটি ছোট মেয়ে আছে। সে কারণে বড় মেয়েকে বাসায় ঠিকমতো পড়ালেখা করানো যাচ্ছে না। এ জন্য মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে, যাতে প্রাথমিক পড়ালেখার কাজটি স্কুল থেকে শেখানো যায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, স্কুলে ভর্তি করানোর পরও মেয়েকে পড়া শেখানোর যাবতীয় কাজ বাসায় তার স্ত্রীকেই করাতে হচ্ছে। উপরন্তু অতিরিক্ত সমস্যা যেটা হচ্ছে, সেটা হলো তাকে স্কুলে দিয়ে আসা এবং নিয়ে আসা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতগুলো পাঠ্যবই এবং ঘন ঘন পরীক্ষা, ক্লাস টেস্ট, মডেল টেস্টের কারণে আমরা অতিষ্ঠ। প্রতিদিন স্কুলের অনেক হোমওয়ার্ক থাকে। এরপর আছে ঘন ঘন পরীক্ষা। একদিন তার মেয়ের এক সহপাঠী তাদের জানিয়েছে স্কুলে পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো না লেখায় তার মেয়ের কান ধরে টেনেছেন এক শিক্ষক। আরেক দিন বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে দুষ্টামির কারণে।’
রফিক আরও জানান, ইংরেজি ‘এ’ অক্ষর দিয়ে তিনটি, ‘বি’ অক্ষর দিয়ে তিনটি ও ‘সি’ অক্ষর দিয়ে তিনটি করে শব্দ লিখতে বলা হয়েছে পরীক্ষার খাতায়। কিন্তু তার মেয়ে প্রশ্ন ভালো করে বুঝতে না পারায় সে ‘এ’ অক্ষর দিয়ে তিনবার ‘আপেল’ শব্দটি লিখেছে। এভাবে ‘বি’ অক্ষর দিয়ে তিনবার ‘বল’ ও ‘সি’ অক্ষর দিয়ে তিনবার ‘ক্যাট’ লিখেছে। এ জন্য তাকে কান টেনে শাস্তি দেয়া হয়েছে। পাঁচ বছরের একটি মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, সেটাই বড় কথা; কিন্তু পরীক্ষায় প্রশ্ন বুঝতে না পারার কারণে তাকে শাস্তি দেয়ার ঘটনা মেনে নেয়া যায় না বললেন ফাইজুল। প্রতিদিন স্কুলের পড়া তৈরির জন্য তার মায়ের বকাঝকা খেতে হয়। এমনকি শারীরিক শাস্তিরও সম্মুখীন হতে হচ্ছে সে।’
রফিক সাহেবের স্ত্রী জানান, নার্সারিতে আমার মেয়েকে যা পড়ায় মনে হয় আমরা হাইস্কুলে তা পড়েছি। সাধারণ জ্ঞান বইয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানীর নাম, স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের নাম, ঢাকার প্রাচীন নাম, কোন ফলে কী ভিটামিন আছে এসব পড়ানো হচ্ছে, যা পাঁচ বছরের শিশুর জন্য কঠিন বলে মনে হচ্ছে। আল্লাহ কি কি সৃষ্টি করেছেন এ প্রশ্নের উত্তরে লেখা হয়েছে পৃথিবী ও সৌরজগতের চারপাশে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।
তার স্ত্রী আরও জানান, তার মেয়েকে কোনো অবস্থাতেই তিনি এ উত্তর শেখাতে পারছেন না। প্রায় সব অভিভাবকই অভিযোগ করেছেন, ক্লাসে শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ান না। এটাই হলো প্রধান সমস্যা। পড়াশোনা মূলত বাসায়ই করাতে হয় সন্তানদের। শিক্ষক যদি ক্লাসে ঠিকমতো পড়াতেন বা স্কুলভিত্তিক পড়া শেখার ব্যবস্থা থাকত তাহলে স্কুলের পর শিশুদের বাসায় এসে এতো পড়ার চাপ সইতে হতো না। কিন্তু স্কুলে ঠিকমতো পড়া শেখার ব্যবস্থা নেই বলে দীর্ঘ সময় স্কুলে ব্যয় করার পর শিশুদের বাসায় পড়ার জন্য আবার অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। ছয়-সাত বছরের একটা শিশুকে পড়ার জন্য এত চাপ দেয়া তাদের কাছে অমানবিক বলে মনে হয় বলে জানান তারা।
অনেক মায়েরা স্বীকার করেছেন, নার্সারি থেকে শুরু করে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের পড়াতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তারা কমবেশি বকাঝকা এবং মারধর করেন শিশুদের। ছোট শিশুরা নিজেরা পড়তে চায় না। কাছে বসে না থাকলে তারা খেলাধুলা এবং দুষ্টামি শুরু করে দেয়। এত বেশি হোমওয়ার্ক আর পরীক্ষার পড়া থাকে যে অল্পসময়ে অনেক পড়া আয়ত্ত করতে বাধ্য কর হয় তাদের। স্বাধীনভাবে পড়তে দিলে সারা দিনেও তারা নিজেরা পড়া মুখস্ত করতে চায় না। উপরন্তু অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন অধিক বইপাঠ্য ভুক্ত করার পেছনে বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের বিশাল আর্থিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। শিশুদের অধিক শেখানোর জন্য নয় বরং প্রকাশকদের কাছ থেকে কমিশনের বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট বইপাঠ্য করে এবং তা শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

