নিজস্ব প্রতিবেদক : এ সরকারের সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা সময় মতো অর্থাৎ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেয়া, সচেতন মানুষ মাত্র এ কথা সবারই জানা। সরকারের আত্মপ্রচারিত বহু সাফলতার মধ্যে অন্তত এটিকে এক বাক্যে মেনে নিয়েছিলো পুরো জাতি। কিন্তু…
মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাতিকে এগিয়ে নেয়ার একমাত্র বিজয়রথ আমাদের সে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও যেন পড়েছে আজ শকুনের সেনদৃষ্টি। হঠাৎ করে যদি এই শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি থেকে ভেসে আসে মৌলবাদের বিজয় অট্টহাসি তাহলে আর স্বার্থকতা মিলবে কোথায়!
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘নাট্যকলা’ নামে সরকার স্বীকৃত দু’টি বিষয় থাকলেও চলতি বছর এগুলোর কোনো পাঠ্যবই ছাপেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শুধু তাই নয়, পাঠ্যবই ছাপার আগেই প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি নিয়মও ভঙ্গ করেছে এনসিটিবি। সেখানেও এ দুটি বিষয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয় নি। ফলে পাঠ্যবই না থাকায় ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রছাত্রীরা চাইলেও এ বিষয় দু’টি পড়তে পারবে না।
অথচ শেকড়ের মানবিক গুরুত্ববহ এ বিষয় দুটি বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মননের প্রতীক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বপন করে। মৌলবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে এ দুটি বিষয়কে পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এখন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই তৈরি না করে এনসিটিবি মৌলবাদীদের সেই অসৎ চাওয়াকেই যেন পূরণ করল।
উচ্চ মাধ্যমিকের সর্বশেষ শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করা হয় ২০১৩ সালের ৪ জুলাই। শিক্ষা সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির’ (এনসিসিসি) ওই সভায় ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জন্য মোট ৩৪টি বিষয়কে নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে মানবিক বিভাগের জন্য ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘নাট্যকলা’ বিষয় দু’টি আছে। অথচ এ বিষয় দু’টি বাদ দিয়ে বাকি ৩২টি বিষয়ের বই ছাপার পন্ডুলিপি আহ্বান করেছে এনসিটিবি। ফলে বই না থাকায় বিষয় দুটি পড়তে পারবে না আগ্রহী শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে নাট্যকর্মীরা বলছেন, তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০ নম্বরের ‘নাট্যকলা’ বিষয়টি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সে সরকারই আছে ক্ষমতায়। এবং বছরের শুরুতে তাদেরই সফলতাতে নতুন বই নিয়ে হইচই শুরু হয়েছিলো সারা দেশে। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই তুলে দেয়ায় গর্ব করেছি আমরা, দেখেছে তা বিশ্ব। কিন্তু পাঠ্যক্রম থেকে ‘চারু ও কারুকলা’ এবং ‘নাট্যকলা’ বিষয় দুটি গেল কই? এটি মেনে নেয়া যায় না।
শিক্ষায় জাতি যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন মিলছে না হিসাব। তবে কি সেই পরাজিত শক্তি শেষ কৌশল হিসেবে জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত হানতে যাচ্ছে?
বিষয়টির তীব্র নিন্দাসহ প্রতিবাদ জানিয়েছে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ ও সব জেলা শাখা সংসদ। একইসঙ্গে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বিষয় দু’টির শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি করে বই ছাপানোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানিয়েছে তারা।

