ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড ও নোট বইয়ের নামে ‘সহায়ক’ বইয়ের বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েছে।
বছরের শুরু থেকেই এসব বই কিনতে প্রতিদিন দোকানগুলোতে ভিড় করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
অধিকাংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই গাইড ও নোট বইয়ের নামে ‘সহায়ক’ বইয়ের সহযোগিতা নেয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কতিপয় শিক্ষক আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওই প্রকাশনীর সহায়ক বই পড়তে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন বলেও জানা গেছে।
গৌরীপুর উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট ১৭৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪২টি নিবন্ধিত কিন্ডার গার্টেন, ৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১৮টি মাদরাসা রয়েছে।
উপজেলা বিভিন্ন এলাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখনো বাজারের প্রকাশিত গাইড ও নোট বইয়ের নির্ভরশীল। যদিও সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতি আরোপ করার পর একমাত্র বোর্ডের নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের উপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের চেয়ে গাইড বই পড়ে অনেকটা মুখস্থ বিদ্যার মতো করে শিখছে সৃজনশীল পাঠ।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাজারের গাইড ও নোট পড়ার জন্য শিক্ষকরাই উৎসাহ দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশনার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিছু অসাধু শিক্ষক আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওইসব প্রকাশনীর বই নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামগোপালপুর ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক জানান, তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একটি অখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নোট ও গাইড শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, জুপিটার, লেকচার, পাঞ্জেরি, দৃষ্টি, আদিল, আল-ফাতাহ, আল-বারকাহসহ একাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব শ্রেণীর, সব বিষয়ের সৃজনশীল বিষয়ের নোট ও গাইড বই পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো কৌশল হিসেবে এসব গাইড ও নোট বইয়ের কভার পেজে ‘গাইড ও নোট’ শব্দটি তুলে দিয়ে সৃজনশীল সহায়ক অনুশীলনমূলক বই শব্দটি ব্যবহার করছে। আর অভিভাবকরা বুঝে কিংবা না বুঝেই এসব বই তুলে দিচ্ছেন ছেলেমেয়েদের হাতে। আর শিক্ষার্থীরা ওইসব ‘সহায়ক’ বই কিনে সৃজনশীল পদ্ধতির পাঠ মুখস্থ শিখছে।
একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধির চাকরি ছেড়ে দেয়া এক ব্যক্তি জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে।
শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বলেন, ‘বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়ার কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। সৃজনশীল পদ্ধতিটা একটু কঠিন। তাই হয়তো অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নমুনা প্রশ্ন বা মডেল টেস্টের জন্য সৃজনশীল সহায়ক বইগুলোর দারস্থ হচ্ছে।’
শালীহর গ্রামের মধুসূদন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শেখ জামাল উদ্দিন বলেন, ‘নোট ও গাইড বইয়ের কারণে সৃজনশীল পদ্ধতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বই বিক্রি বন্ধে অসাধু প্রতিষ্ঠান ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।’
গৌরীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক সরকার বলেন, ‘মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে গাইড বই ও কোচিংয়ের সাহায্য ছাড়াই শিক্ষার্থীদের প্রতিভা, মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল মনন গড়ে তোলাই সৃজনশীল পদ্ধতির লক্ষ্য। পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়লে নোট ও গাইড বইয়ের সাহায্য ছাড়াই সব প্রশ্নের উত্তর করা সম্ভব। তারপরও শিক্ষার্থীরা নোট ও গাইড বইয়ের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এসব বই বন্ধ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ে না।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘উপজেলার বিভিন্ন বাজারে সৃজনশীল সহায়ক নোট ও গাইড বই বিক্রি হয় এ বিষয়টি আমি অবগত নই। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে শিক্ষকরা আর্থিক সুবিধা নেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

