পাবনা প্রতিনিধি : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার্থীদের কৌশলে জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা নিয়ে প্রবেশপত্র দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
অবশ্য শিক্ষকদের দাবি, ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রবেশপত্র বিতরণের সময়ে কলেজের সেমিনার, ইনকোর্সসহ নির্ধারিত কিছু ফি নেয়া হচ্ছে। অথচ এই শিক্ষার্থীরা ফরম পূরণের সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় কলেজের পরীক্ষা সংক্রান্ত সমুদয় টাকা আগেই পরিশোধ করেছে।
এদিকে, ফরম পূরণের সময়ে ফি কমানোর দাবিতে পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে গেলে অধ্যক্ষ তাদের আশ্বাস দিয়ে একের পর এক প্রতারণা করায় ফুঁসে উঠেছে কলেজের শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে, প্রবেশপত্র দেয়ার সময়ে অতিরিক্ত যে টাকা আদায় করা হচ্ছে, সে টাকারও কোনো রশিদ দেয়া হচ্ছে না বলেও ভূক্তভোগী পরীক্ষার্থীরা জানান।
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের ১৮টি বিভাগের স্নাতক সন্মান দ্বিতীয় বর্ষের ফরম পূরণ কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। আর ওই সময়েই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল ফি আদায় করে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
শিক্ষার্থীরা জানান, আগামী ২২ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শুরু হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র চলে এসেছে সংশ্লিষ্ট কলেজের বিভিন্ন বিভাগে। অথচ এই প্রবেশপত্র পরীক্ষার্থীদের হাতে দেয়ার সময়ে ১৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেয়া হচ্ছে। কীসের টাকা? কেন দিতে হবে? পরীক্ষার্থীদের এমন প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকরা সদুত্তর না দিয়ে বাধ্যতামূলক তাদের এই টাকা পরিশোধ করতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যে সকল পরীক্ষার্থী এই টাকা পরিশোধ করছেন, শুধুমাত্র তাদেরকেই পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেয়া হচ্ছে।
কলেজের একাধিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, দ্বিতীয়বর্ষের পরীক্ষার সময়ে ফরম পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ও কলেজের বিভিন্ন ফি একত্রে মোটা অংকের টাকা হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ওপর এর চাপ পড়ে। অনেক পরীক্ষার্থী এতো টাকা একসাথে পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায় দুই ধাপে এই টাকা নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, সন্মান দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার ফি সব মিলিয়ে মোটা অংকের টাকা হওয়ায় ফরম পূরণের সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত ফি গ্রহণ করা হয়। আর পরীক্ষার্থীদের জানানো হয়, প্রবেশপত্র দেয়ার সময়ে সেমিনার ফি, ইনকোর্স ফিস বাবদ টাকা নেয়া হবে।
কিন্তু ফরম পূরণের পর প্রবেশপত্র দেয়ার সময়ে কোনো পরীক্ষার্থীর কাছে টাকা নেয়াটা নিয়মের মধ্যে পড়ে কী না- এমন প্রশ্নে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. নাইদ মো. শামসুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র বিতরণে টাকা নেয়ার বিষয়টি প্রথম স্বীকার করলেও পরে অবস্থান বদলান। তবে কেন ও কী জন্য এই টাকা নেয়া হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক জবাব না দিয়েই মুঠোফোন কেটে দেন।
এ ব্যাপারে কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ আলী সোহেল বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগ পেয়ে অধ্যক্ষ স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। স্যার বলেছেন, তোমাদের নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেই এই টাকা নেয়া হচ্ছে।
সোহেল আরো বলেন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে কয়েকদিন আগে দায়িত্ব পেয়েছি। আমার আগের সভাপতি ও অন্যরা কী আলাপ আলোচনা করেছেন, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
এ ব্যাপারে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লা আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে, একাধিক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সন্মান দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার্থীরা ফরম পূরণের বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে সম্প্রতি কলেজের সামনে পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন, মানববন্ধন ও ২ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. নাইদ মো. শামসুল হুদা উপস্থিত হয়ে ফরম পূরণের ফি হ্রাস করার আশ্বাস দিলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেন।
বাংলা, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস, ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময়ে অধ্যক্ষ স্যার ফি কমানোর আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাবে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ে মেতে উঠেছেন। তারা বলেন, অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক এবং ছাত্র নেতারা জোটবদ্ধ হয়ে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আমাদের সঙ্গে প্রতারণাও করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দর্শনের এক শিক্ষার্থী বলেন, তিন দফায় বিভাগ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে। প্রথম অবস্থায় ১৯৫০ টাকা দিয়েছি। পরবর্তীতে আরো ২৩৩০ টাকা দিয়েছি। এখন প্রবেশপত্র নেয়ার সময়ে ১৪০০ টাকা দাবি করা হয়েছে।
বাংলার পরীক্ষার্থী পাপিয়া খাতুন বলেন, বিভাগ থেকে ফরম পূরণের সময়ে ৬০০০ টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীরা ফি কমানোর জন্যে আন্দোলন শুরু করলে অধ্যক্ষ স্যার ১৫০০ টাকা কমিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন। ৬০০০ টাকা জমা দেয়ার পর বিভাগ থেকে ১৫০০ টাকা ফেরৎ দেয়া হলেও প্রবেশ পত্র নেয়ার সময়ে তাকে নতুন করে ১৫৬০ টাকা জমা দিতে হয়েছে।
পাপিয়া আরো বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে ভিন্নমাত্রার প্রতারণা করেছে। প্রবেশপত্র দেয়ার সময়ে এই প্রথম দেখছি টাকা নেয়া হচ্ছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিমত, উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠে দিনদিন ঐতিহ্য আর সুনাম ক্ষুন্ন করা হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন, অধ্যক্ষ, শিক্ষক, ছাত্রনেতাসহ একটি স্বার্থন্বেষী মহল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গণসহ কলেজের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

