দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অবস্থান করা প্রতিষ্ঠানটি এবার গড় পাসের হারে ঢাকা মহানগরীর শীর্ষ ২০ কলেজের তালিকায় স্থান পায়নি। অন্যদিকে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ১৯তম। এ ফলাফলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়েছে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মোট ২ হাজার ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত হন। তাদের মধ্যে ১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ২ হাজার ৩৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২ হাজার ২৩৮ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ১৩৯ জন। প্রতিষ্ঠানটির মোট পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪১৬ জন, যা অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১ হাজার ৮১৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ হাজার ৭০২ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ১১১ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৯৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৩৩ জন। মানবিক বিভাগে ২৯১ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে পাস করেছেন ২৭৪ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৮ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২৭৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ২৬২ জন। পাসের হার ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫৫ জন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একসময় ফলাফলের দিক থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এমন ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং শিক্ষার পরিবেশের অবনতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব সমস্যার জন্য তারা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম ও তার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত একটি শিক্ষকগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিভাবকদের দাবি, এর আগেও মাজেদা বেগম ৬ মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষার ফলাফলে অনুরূপ অবনতির ঘটনা ঘটেছিল। তাদের মতে, বর্তমান ফলাফল প্রতিষ্ঠানের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তারা অবিলম্বে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
অভিভাবকদের কেউ কেউ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাদের দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সন্তানদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করবেন তারা।
এবারের ফলাফল প্রকাশের দিনে প্রতিষ্ঠানের চিরচেনা উৎসবমুখর পরিবেশের দেখা মেলেনি। সাধারণত ভালো ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, নাচ-গান ও উদ্যাপনে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন চিত্র। ফলাফল জানতে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আনন্দের পরিবর্তে বিরাজ করছিল হতাশা ও বিষণ্নতা। অনেক শিক্ষার্থীকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
অভিভাবকদের অভিযোগ, ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও দায় নির্ধারণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, শুধু বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে এমন অবনতি শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার করা হবে।

