বিনোদন ডেস্ক: প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর মধ্যে যতগুলো শিল্প রয়েছে তার মধ্যে মৃৎশিল্প অন্যতম। আদিম মানুষ যখন তার সভ্যতাকে খুঁজে পায়নি তখন থেকেই মৃৎশিল্পের ধারণা ব্যবহার ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। মৃৎশিল্পে বাংলাদেশের যেমনি ঐতিহ্য রয়েছে তেমনি এর সুপ্রাচীন নকশা ও তৈরিতে রয়েছে এক ধরনের বৈচিত্যময়তা। প্রাচীন এ মৃৎশিল্পকে কেন্দ্র করে শত শত বছর আগে গড়ে উঠেছিল পাল বা কুমরা। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এখনও শত কষ্টের মধ্যে তৈরি করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের অন্যতম আকর্ষণ রাজশাহীর শখের হাঁড়ি।
এক সময় বাংলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য রাজশাহীর শখের হাঁড়ির বেশ চাহিদাও ছিল। বিয়ে বাড়ি বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে শখের হাঁড়ি উপহার পাঠানোর নিয়মও ছিল। রাজশাহীর শখের হাঁড়ি নিয়ে বলতে গিয়ে রাজশাহীর বসন্তপুরের স্থানীয় শখের হাঁড়ির নির্মাতা ও ব্যবসায়ী সুশান্ত কুমার পাল বলছিলেন, আগেতো গ্রাম বাংলায় পাকা দালানকোঠা বা বিল্ডিং ছিল না। মাটির জিনিসপত্র বেশি ব্যবহার করত। এছাড়া আগে একটা সময় গ্রামে গীত হত তখন নানা অনুসঙ্গ হিসেবে শখের হাঁড়ির ব্যবহার করা হত। এখন আর গীত এরও প্রচলন নেই যার কারণে শখের হাড়ির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এর পাশাপাশি প্লাস্টিক, অ্যালমুনিয়ামসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র বানানোর কাঁচামাল এখন বদলে গেছে। তাই এখন আর আগেরমত শখের হাড়িসহ মাটি দিয়ে তৈরি তৈজসপত্রের আগের মত কদর নেই।
রাজশাহীতে একটা সময় প্রায় ৪৫০০ পরিবার শখের হাঁড়ি বানিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। এখন মাত্র গুটি চার পাঁচেক পরিবার তাদের বাবা দাদার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে শখের হাঁড়ি তৈরির এ পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। শখের হাড়ি তৈরির পর এর মূল্যমান নিয়েও কষ্ট রয়েছে এর সঙ্গে জড়িত কুমার বা শিল্পীদের। বছরের বিভিন্ন সময়ে সোনারগাঁও জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর, চ্যানেল আই প্রঙ্গন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা আর্ট কলেজ, শিল্পকলা একাডেমী, কারুশিল্প পরিষদসহ বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু এরপরও শিল্পীদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে অনেক জায়গায় প্রশ্ন থেকে যায়।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে কালের পরিবর্তন ও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে দিন বদলের চেষ্টা। বর্তমানে বিভিন্ন সিরামিক, স্টিল, মেলামাইন, কাঁচ ও লোহার তৈরি আসবাবপত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকার কারণে এখন আর মাটির তৈরি শখের হাঁড়ি চোখে পড়ে না। চোখে পড়লেও গ্রামের কিছু মাটির তৈরি হাড়ি পাতিলের দেখা মেলে যা খোদ এ পেশার সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের কথা থেকেই বোঝা যায়। সাধারণ মানুষ আবার মৃৎশিল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্রের ব্যবহার শুরু করে শখের হাঁড়ির সুদিন ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কুমার বা ব্যবসায়ীরা।
যেহেতু মৃৎশিল্প বাংলার হাজারও বছরের ঐতিহ্য বহন করে সেহেতুতাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারসহ সকলের এগিয়ে আসা উচিত। তা নাহলে ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে মৃৎশিল্প একসময় মুছে যেতে বাধ্য হবে। মৃৎশিল্প যেন বাংলার ঐতিহ্য থেকে মুছে না যায় এ বিষয়টাই এখন মূল চাওয়া শখের হাড়ির তৈরি পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের।

