এল-নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চরমভাবপন্ন হয়ে উঠছে আবহাওয়া। ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে এটি। এর মধ্যেই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) বার্তা, ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এই এল-নিনোর প্রভাব, যা অব্যাহত থাকতে পারে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমও জানিয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়তে পারে। একইসঙ্গে মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র হতে পারে এর প্রভাব।
ডব্লিউএমও তাদের মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেটে’ জানিয়েছে, ডিসেম্বর মাসে পূর্বাভাস অনুযায়ী শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে এল-নিনো আরও শক্তিশালী হবে। এর প্রভাবে বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে বৃষ্টিপাতের ধরনেও। ফলে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে পারে খরা ও বন্যার ঝুঁকি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে মধ্য ও পূর্ব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড পরিমাণে বাড়তে পারে। এল-নিনো পরিস্থিতি দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থা, অর্থনীতি, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনযাত্রায়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১৩টি শীর্ষ আবহাওয়া কেন্দ্রের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।
ডব্লিউএমওর প্রধান সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল-নিনো ইতোমধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং খুব দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে এই পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকবে। ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড হওয়া সর্বকালের অন্যতম শক্তিশালী এল-নিনো হতে পারে এটি।
সাউলো বলেন, এল-নিনো পৃথিবীতে নতুন করে কোনো উত্তাপ তৈরি করে না; বরং মহাসাগরে জমে থাকা তাপ মুক্ত করে। বর্তমানে যে মহাসাগর থেকে এই তাপ বের হচ্ছে, সেটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উত্তপ্ত। ফলে সেখান থেকে মুক্ত হওয়ার মতো তাপের পরিমাণও বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা মাপার যে সূচকটি এল-নিনোর মূল নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটির মান গত জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হবে। এর আগে ২০১৫-২০১৬ সালের এল-নিনোর সময় এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়েছিল।
সর্বশেষ এল-নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর এবং ২০২৪ সাল এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হয়ে উঠেছিল। ওই সময় বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী ১৮৫০-১৯০০ সময়ের গড়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল-নিনো চরম আকার ধারণ করে। তবে, এর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কিছুটা পরে অনুভূত হয়। ইতোমধ্যেই এবারের এল-নিনো কিছু অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্য আমেরিকায় খরার কারণে পশুপাখি ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।

