ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে। ইরানের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত তীব্র হচ্ছে জ্বালানি তেলের সংকট। যুদ্ধ শুরুর পর গেল এক মাসে তেল-গ্যাস বাবদ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়েছে বলে জানায় ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ৬৫ মার্কিন ডলার।
কিন্তু এক মাসের মধ্যেই তা ১১০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এই যুদ্ধ যদি আরও ছয় মাস স্থায়ী হয়, তবে জ্বালানি তেল ব্যারেলপ্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার এবং যুদ্ধ এক বছর স্থায়ী হলে তেলের মূল্য ২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন
‘নিজেরাই নিজেদের তেল সংগ্রহ করো’, যুদ্ধে না জড়ানো দেশগুলোকে ট্রাম্প
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম এক মাসেই তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়িক খাতে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংস্থা ৩৫০.ওআরজি। সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১১১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
শেভরন, শেল ও এক্সন মোবিলের মতো বড় তেল কোম্পানিগুলো এই সংকট থেকে বিপুল অপ্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের অবস্থানে রয়েছে। তারা সরকারগুলোকে এই অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর আরোপ করার আহ্বান জানিয়েছে ও সেই কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করে জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগই দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা ও ভবিষ্যতের সংকট থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের প্রভাব এপ্রিল থেকে ইমার্জেন্সি অপশন চালু করে বিমান পরিষেবা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছে জাপান। এদিকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে বিকল্প পথে তেল রপ্তানি শুরু করেছে সৌদি আরব।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে তেল রপ্তানি শুরু করেছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে গত দুই সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে তারা। যা স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশি। তবে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় লোহিত সাগরের ওই বিকল্প পথটিও এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এদিকে নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার করে সরকারি বাসভবনে ফিরছেন থাই প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। তিনি ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যে ই-ভেইকেল হতে পরে সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) থাইল্যান্ডে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৪০ বাথ ছাড়িয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে ডিজেলের দাম বেড়েছে থাইমুদ্রায় ১০ বাথ পর্যন্ত। বিশ্ববাজারে সোমবারের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও মঙ্গলবার প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড বিক্রি হয়েছে ১০৬ থেকে ১০৯ ডলারে।
পরিবেশবাদী সংগঠন থ্রিফিফটি ডট ওআরজি বলছে, যুদ্ধের প্রথম মাসে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আর এই সুযোগে মুনাফার অংক বাড়াচ্ছে শেভরন, শেল, এক্সন মবিলের মতো তেল কোম্পানি।
এরইমধ্যে এই সংকট মোকাবিলায়, তেল কোম্পানিগুলোর অপ্রত্যাশিত মুনাফার ওপর নতুন করের প্রস্তাব করেছে ফিলিপিন্স। তেল রপ্তানির ওপর পুনরায় ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ চালু করেছে ভারতও। আর, জ্বালানি খাতে স্বনির্ভর হতে ১০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ইন্দোনেশিয়া।
স্থানীয় সময় রাত ৯টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে মিশর। এ ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাকার্তার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার বেইজিংয়ের। আর এপ্রিল থেকে ইমার্জেন্সি অপশন চালু করে বিমান পরিষেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
হরমুজের পর যদি লোহিত সাগর দিয়েও তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।
সূত্র : ব্লুমবার্গ, আলজাজিরা।

