মুসলিম শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় একটি মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতি বাতিলের অভিযোগ উঠেছে ভারতে। ঘটনাটি ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীরের কাটরায় অবস্থিত শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স (এসএমভিডিআইএমই)-এ। হিন্দুত্ববাদীদের বিক্ষোভের মুখে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির এমবিবিএস কোর্স পরিচালনার অনুমতি বাতিল করেছে ভারতের জাতীয় মেডিকেল কমিশন (এনএমসি)। এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে ভারতজুড়ে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানান যায়, এসএমভিডিআইএমই’র প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে মোট ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জনই ছিলেন মুসলিম। এটি নিয়ে ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী সংগ্রাম সমিতি’ নামে প্রায় ৬০টি আরএসএস ও বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠন কলেজটির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তারা মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিলের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।
এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা এবং ক্লিনিক্যাল সুবিধায় গুরুতর ঘাটতির কথা উল্লেখ করে এমবিবিএস কোর্স পরিচালনার অনুমতি বাতিল করে মোদী সরকার।
জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই সিদ্ধান্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শীর্ষ প্রশাসনের দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। জম্মুতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যদি মেডিকেল কলেজে ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে সবার কাছে জবাব চাইতে হবে। আপনারা একটি মেডিকেল কলেজ খুললেন, কিন্তু এনএমসি পরিদর্শনে তা পাস করতে পারলো না কেন?’
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাকিনা ইতোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের দ্রুত তাদের নিজ নিজ এলাকার নিকটবর্তী সরকারি মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা যায় এবং তাদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ একটি মেডিকেল কলেজ পাওয়ার জন্য লড়াই করে, আর এখানে আমরা যা পেয়েছিলাম, সেটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য আন্দোলন করা হয়েছে—এটি দুর্ভাগ্যজনক।
গত বুধবার এক জনসভায় ওমর আবদুল্লাহ বিজেপি ও সংগ্রাম সমিতির নেতাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি বলেন,
‘কিছু মানুষ এই স্বীকৃতি বাতিলের সিদ্ধান্তে উৎসব করছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে যদি আনন্দ পাওয়া যায়, তাহলে আপনারা বাজি ফাটান।’
তিনি বলেন, ‘এবার ৫০ আসনের মধ্যে ৪০টি কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরা পেয়েছে। এক–দুই বছরের মধ্যে এই ৫০ আসন ৪০০তে পরিণত হতো, আর তার মধ্যে ২০০ বা ২৫০ আসন যেতো জম্মুর ছেলেমেয়েদের কাছে। কিন্তু ধর্মের নামে পুরো কলেজই বন্ধ করে দেওয়া হলো।’
জম্মু ও কাশ্মীরের শিবসেনা, আম আদমি পার্টি ও কংগ্রেসও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে।
শিবসেনার রাজ্য সভাপতি মনীশ সাহনি বলেন, মুসলিম শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমস্যা থাকলে তা সমাধানের পথ খোঁজা উচিত ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার পুরো কলেজই বন্ধ করে দিলো।
জম্মু ও কাশ্মীর কংগ্রেসের মুখপাত্র রবিন্দর শর্মা বলেন, ‘মাতা বৈষ্ণোদেবীর নামে একটি প্রধান মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জম্মু কী পেলো, বিজেপিকে তার জবাব দিতে হবে।’
এনসি নেতা রতন লাল গুপ্ত বলেন, এই সিদ্ধান্ত বিজেপির ‘জম্মু-বিরোধী ও যুব-বিরোধী রাজনীতির’ প্রতিফলন।
বুধল বিধায়ক জাভেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘যদি শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত হওয়ায় এই কলেজের স্বীকৃতি বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে এটি একটি ভয়ংকর ও লজ্জাজনক বাস্তবতা। যখন মেধা অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হয়।’
জম্মু ও কাশ্মীর বিজেপির সভাপতি সত শর্মা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এনএমসি অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার দাবি, মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে নিজের সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
এনএমসি জানিয়েছে, চলতি মাসে আকস্মিক পরিদর্শনে তারা কলেজটির অবকাঠামো ও সুযোগ–সুবিধায় গুরুতর ঘাটতি পেয়েছে। তবে এসএমভিডিআইএমই কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদনকে ‘তথ্যবিরোধী’ ও ‘প্রহসন’ বলে দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, পরিদর্শক দল আগে থেকেই কলেজটি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এসেছিল, যাতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে আন্দোলনকারীদের তুষ্ট করা যায়।

