স্পোর্টস ডেস্ক : দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের বড় আসরের মূল লড়াইয়ে বারবার ভেঙে পড়ে বলে ‘চোকার্স’ তকমা জুটেছে তাদের। বারবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ‘জুজু’ কাটানোর ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়ে প্রোটিয়াদের। দরজায় যখন ফের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল কড়া নাড়ছে তখন সেই ‘চোকার্স’ উপাধিটি আবারও সামনে চলে আসছে। ক্রিকেট বিশ্বের জিজ্ঞাসা,ফের ‘চোক’ করবে না তো দক্ষিণ আফ্রিকা?
২২ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ১৯৯১ সালের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফের দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রা শুরু হয়। তখন থেকেই ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই (২০০৩ বিশ্বকাপ ছাড়া)দাপটের সঙ্গে নকআউট পর্বে উত্তীর্ণ হয় প্রোটিয়ারা। তবে নকআউট পর্বে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় ক্রিকেটের পরাশক্তি দেশটি। এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে নক আউট পর্বে জয়ের মুখ দেখেনি ‘চোকার্স’রা। বৃষ্টি আইন,দুর্ভাগ্যজনক রান আউট কিংবা ক্যাচ মিস ইত্যাদি নানা কারণে নকআউট পর্বে বারবার মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে প্রোটিয়াদের।
১৯৯২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে দাপটের সঙ্গে খেলে সেমিফাইনালে ওঠে কেপলার ওয়েসেলসের দক্ষিণ আফ্রিকা। ২৫৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমে জয়ের পথেই ছিল প্রোটিয়ারা। কিন্তু হঠাৎ করে বৃষ্টি তাদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জয়ের জন্য শেষ ১৪ বলে প্রয়োজন ছিল ২২ রান। হাতে তখনও ৪ উইকেট। কিন্তু বৃষ্টি আইনে শেষ পর্যন্ত প্রোটিয়াদের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১ বলে ২২ রানে। নিশ্চিত জয় হাত ফসকে গেল বৃষ্টির কারণে। ফলে জয়ের পথে থাকা প্রোটিয়ারা পরাজয়ের হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
১৯৯৬ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ফর্মে ছিল হেনসি ক্রনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে এবার কোয়ার্টার ফাইনালে এসে এক ব্রায়ান লারার কাছে হেরে গেল প্রোটিয়ারা। লারার অনবদ্য ১১১ রানের ইনিংসের সুবাদে ২৬৪ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর দাঁড় করায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ব্যাট করতে নেমে জবাবটা ভালোই দিচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩ উইকেট হারিয়ে ১৮৬ রান করে ফেলেছিল তারা। এরপরই ‘চোক’ করে বসে প্রোটিয়ারা। ১৮৬ থেকে ১৯৮- এই ১২ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত ১৯ রানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ক্রনিয়ের দলকে।
‘চোকার্স’ অপবাদ প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকার নামের সাথে সেঁটে যায় ১৯৯৯ বিশ্বকাপে। সেবার সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে নিশ্চিত জয়ী ম্যাচটি হেরে বসে এক হার্সেল গিবস স্টিভ ওয়াহর ক্যাচ ফেলে দেওয়ার কারণে। সেমিফাইনালে সেই অস্ট্রেলিয়ারই মুখোমুখি তারা। এই ম্যাচটিতেও নিশ্চিত জয়ের মুখে দাঁড়িয়ে প্রোটিয়ারা। অস্ট্রেলিয়াকে ২১৩ রানে আটকে দিয়ে জয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে তারা।
শেষ ওভারে এসে দুই দলের স্কোর সমতায় এসে দাঁড়ায়। জয়ের জন্য শেষ ৩ বলে দরকার ১ রান। দারূণ খেলতে থাকা ল্যান্স ক্লুজনার অস্ট্রেলিয়ার ডেমিয়েন ফ্লেমিংয়ের বলে ব্যাট ছুঁয়েছেন মাত্র। নন স্ট্রাইকে থাকা অ্যালান ডোনাল্ড দিলেন পাগলাটে দৌড়। মার্ক ওয়াহ আর ফ্লেমিংয়ের হাত ধরে বল চলে যায় উইকেটরক্ষক অ্যাডাম গিলক্রিসের হাতে। বেল ফেলে দিয়েই উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা অসি শিবির। নিশ্চিত জয়ের সামনে দাঁড়িয়েও হারতে হলো। যার দায় পুরোপুরি ডোনাল্ডেরই।
এরপর এলো ২০০৩ বিশ্বকাপ। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করার সৌভাগ্য লাভ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। সবাই প্রোটিয়াদের ফেভারিট ভাবতে শুরু করে। তবে এবার গ্রুপ পর্বও পার হতে পারেনি তারা। তিন তিনবার বৃষ্টির আঘাতে স্বপ্ন ভাঙে স্বাগদিকদের। উদ্বোধনী ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৩ রানের পরাজয় দিয়ে প্রোটিয়াদের হতাশার শুরু। ওয়েস্ট ইন্ডিজের করা ২৭৮ রানের জবাবে বৃষ্টির কারণে ১ ওভার কমে টার্গেট সেই ২৭৯-ই থাকে প্রোটিয়াদের সামনে। ৪৯ ওভারে ৯ উইকেটে ২৭৫ রান করতে সক্ষম হয় স্বাগতিকরা। পুরো ওভার খেলতে পারলে হয়তো জয় পেত ‘অপয়া’ দলটি। কিন্তু প্রকৃতি তাদের সঙ্গে এবারও শত্রুতা করল।
এরপর শ্রীলংকার বিপক্ষেও প্রকৃতি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তামাশা করল। আগে ব্যাটিং করে শ্রীলংকা ২৬৮ রান সংগ্রহ করে। এরপর বৃষ্টির আঘাতে ম্যাচে দৈর্ঘ্য কমিয়ে ৪৫ ওভারে নামিয়ে ২৩০ রানের লক্ষ্য দেয়া হয় প্রোটিয়াদের। কিন্তু নির্ধারিত ৪৫ ওভারে ২২৯ রানে আটকে যায় স্বাগতিকরা। ফলে ম্যাচটি ড্রয়ে পরিণত হয়। যদিও এই ম্যাচে পরাজয়ের দায় পুরো অধিনায়ক শন পোলকের। কারণ, সুক্ষ একটি হিসেবের ভুলের কারণেই হারতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে।
পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টি ও স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিশ্চত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার। হার্শেল গিবসের অনবদ্য ১৪৩ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে ৩০৬ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর দাঁড় করায় স্বাগতিক দলটি। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের পরিসর কমিয়ে ৩৯ ওভারে নামিয়ে আনা হয়। কিউইদের ২২৯ রানের লক্ষ্য দেয়া হয়, যেটি ৫০ ওভারে ৩০৭ রানের লক্ষ্যের চেয়ে তুলনামূলক সহজ। নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের ১৩২ বলে ১৩৪ রানের হার না মানা ইনিংসের কল্যাণে কিউইরা মাত্র ১ উইকেট হারিয়েই জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলে।
২০০৭ বিশ্বকাপের আসর বসে ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এবারও শুরু থেকে দুর্দান্ত খেলে সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রায়েম স্মিথ, ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক ক্যালিস ও মার্ক বাউচারদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয় চোকার্সরা। কিন্তু শন টেইট ও গ্লেন ম্যাকগ্রার বোলিং তোপে পড়ে মাত্র ১৪৯ রানে গুটিয়ে যায় প্রোটিয়ারা। শন টেইট চারটি এবং ম্যাকগ্রা নেন তিনটি করে উইকেট। জবাবে ৩ উইকেট হারিয়ে হেসেখেলেই সেই লক্ষ্য অতিক্রম করে অসিরা।
২০১১ বিশ্বকাপে গ্রায়েম স্মিথ ঘোষণা দিয়ে এসেছিলেন নকআউট পর্বের ‘জুজু’ কাটাবেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ডেল স্টেইন, মরনে মরকেল ও ইমরান তাহিররা প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে ২২১ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয়ের পথ তৈরি করে দেন ব্যাটসম্যানদেরকে। তবে কেন তাদের চোকার্স বলা হয়, যেনো সেটি প্রমাণ করতেই তাড়াহুড়ো করে গুটিয়ে যায় প্রোটিয়ারা। মাত্র ১৭২ রানে অলআউট হয়ে ৪৯ রানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে গ্রায়েম স্মিথের দল।

