লেখক: ভাস্কর চৌধুরী
জীবনে চিন্তাজগতে বা বলা যায় চেতনা তৈরির জগতে যে যেখান থেকে যাত্রা আরম্ভ করে , সেখান থেকে সামনে যাবারই নিয়ম। এই সূত্রে কবি আলীআফজাল খান ১৯৯৬-৯৭ সাল থেকে চিন্তা চেতনাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সে সময়ে কিছু অগ্রগামী গ্রুপের সাথে আড্ডা ও গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি ও উন্নত চেতনাজগতের সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাদের গ্রুপটি বিভিন্ন সময় চিন্তক ও অগ্রগামী প্রগতিবাদীদের কিছু সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। তারা যে সবগুলোই সঠিক কাজ করেছিলেন , সেটি আমার মনে হয়নি। তবে তাদের মনজগতে”জিজ্ঞাসা” ক্রমাগত আঘাত করছিলো। এ থেকে তারা আলী আফজাল খানের সম্পাদনায় পোষ্ট মর্ডান চিন্তার প্রথম প্রকাশ ঘটান ভিন্নচোখ শিরোনামে একটি পেপার সাইজ পত্রিকা প্রকাশ করে। সেখানেই দেখা যায়, আলী আফজাল খানের অগ্রবর্তী পঠন ও চিন্তার চিহ্নরূপ। এই সময়কালেই দুই বাংলার লিটল ম্যাগভিত্তিক উত্তরাধুনিক চেতনাবাদী কবিতা লেখার সাথে তিনি যুক্ত হন। এসব ঘটে খুব নিভৃতে। কবি আলী আফজাল খান তার চর্চাকে পরিমার্জিত করতে করতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। ২০০৪ সালে তার লিটল ম্যাগাজিনটি বন্ধ হবার পর তিনি আড্ডা ও পঠনের মাধ্যমে আপন কবিতাকে বিনির্মান করে ৯৯ কবিতা নিয়ে ২০১৩ সালে তার প্রথম কাব্যসংকলন “রাধা আমার দ্রৌপদী আমার” শিরোনামে বের করে বোদ্ধা পাঠকশ্রেণীর চোখে পড়ে যান। কবিতার বইটি বাংলাদেশের সমচিন্তা জগতে একটি মাইলফলক। ‘রাধা আমার দ্রৌপদী আমার’ গ্রন্থটির ভেতরে গ্রথিত কবিতাগুচ্ছ একত্রিত করে দেখা গেছে, কবি এখানে পোষ্টমর্ডান চিন্তায় জ্যাক দেরিদার বিনির্মান তত্ব ছাড়াও মিচেল ফুকোর প্রতাপ তত্বের প্রভাবে কবিতাচর্চা করেছেন। তবে এটি এঁটেলমাটির মতো এতোটা শক্ত কবিতা নয়। প্রণয় ও নারী পুরুষের ভেতরের আরো অনেক মানবিকবোধে এই গ্রন্থের কবিতাগুলো পেয়েছে অনেক মানবিক গুণাবলী যা পোষ্ট মর্ডান স্বীকার করে কম। কিন্তু কবি আলী আফজাল খান ওসবের তোয়াক্কা না করে নিজের চিন্তার হৃদয়কে এখানে মেলে ধরেছেন। রক্তাক্ত ও চেতনাবিম্বিত কবিতার এক যুগলবন্ধি হচ্ছে তার এই ৯৯ করিতার ১৪৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি। পরের বছর তিনি বাংলাদেশের ৪০ জন জীবিত কবির বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে বের করলেন একটি আকর গ্রন্থ বাংলাদেশের কবি ও কবিতা সংখ্যা। এই সংখ্যা বাংলাভাষাভাষী চিন্তকদের চোখে পড়েছে। কারণ এ গ্রন্থে তিনি কবিতা ছাড়াও দিয়েছেন ৪২টি চিত্রকর্মের ছবি। অপূর্ব তার চিন্তাশৈলী।
এখানেই থামলেন না আলী আফজাল খান। তার চিন্তাকে এগিয়ে নিতে গিয়ে তিনি চাকুরীটাও ছেড়ে সার্বক্ষনিক কবিতে পরিনত হলেন। সাথে লেখার ভাষারূপ নিয়েও তিনি কাটাছেঁড়া করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কবিতা লেখা চলছে।পত্রিকাও মাথার ভেতর কাজ করে চলছে। ২০১৪-তেই বেরিয়ে গেলো ভিন্নচোখের অপূর্ব এক নিবেদন ‘ভাষাসংখ্যা’। এটিও সুধীমহলে আলোড়ন তুলেছে। ২০১৫ বইমেলায় এলো তার সত্যকারের পোষ্টমর্ডান কবিতার সম্ভার-‘এন্টিম্যাটার’। অদ্ভুত কবিতা আর আরো অদ্ভুতনাম। আমি বইটি পড়ে অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, স্বল্পবাক এ ছেলেটি কিভাবে মানবিকতাকে উপস্থিত রেখেই নিজের ধ্যানকে নিজের কবিতায় সজ্ঞানে প্রতিস্থাপন করতে পারলেন। একমাত্র পোষ্টমর্ডান পন্ডিতই তার এই ‘এন্টিম্যাটার’ গ্রন্থটিকে সঙ্গায়িত করতে পারবেন। আমি বলি অপূর্ব।
বাংলাদেশে ঢাকা কেন্দিক সাহিত্য চর্চা জগতে ও ঢাকার বাইরে কবিতা চর্চাক্ষেত্রে জড়িত অনেকেই জানেন কবি আলী আফজাল খান একজন ভিন্ন ধারার কবি। ধারাটির নাম উত্তরাধুনিক ধারা। এই ধারা নিয়ে ১৯৯৬ থেকেই তার কাব্য ও মনন চর্চা যে অন্য মাত্রায় চলছে তা আজো বাঁক নেয় নি। এর মাঝে কুড়ি বছর পার হয়ে গেছে। তার প্রথম কাব্যসংকলণ ১৪৪ পৃষ্ঠার বই “রাধা আমার দ্রৌপদী আমার ” আমি পড়েছি। এ নিয়ে আমি অল্পবিস্তর লিখেছি। তখন জ্যাক দেরিদা, হাইডেগার বা ফুকোর মতো পোষ্ট মর্ডান পন্ডিতের বিভিন্ন তত্বে আক্রান্ত কবি আলী আফজাল কিন্তু তার প্রথম গ্রন্থে এন্টি অথরশিপ বা আমিবিহীন সত্বাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন নি। তিনি মানবিক চেতনা সম্বৃদ্ধ বিনির্মান তত্ব বা প্রতাপ তত্বের ছায়া নিয়ে গ্রন্থটি সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোন থেকেই লিখেছিলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত পূর্বেই লেখা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে ভিন্নচোখ প্রকাশনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে আমি জানতে পারি , আলী আফজাল খান এবার দুবছর পর নতুন ধারা ও ধারণা নিয়ে লেখা “এন্টিম্যাটার” নামে চৌষট্টি পৃষ্ঠার একটি নতুন বই আনছেন। প্রতীক্ষা করতে করতে ১৩ ফেব্রুয়ারী রাতে আমি প্রথম ক্রেতা হিশেবে বইটি হাতে নিলাম। চারু পিন্টুর ব্যতিক্রমী প্রচ্ছদে ঢাকা পেপার ব্যাক প্রচ্ছদ। অপূর্ব প্রকাশনা। ম্যাট কাগজে সেজে বই আমার পঠনে এলো। প্রথমেই চমকিত সেই সিরিজ “হের্মেনেত্য”। এ কবিতা নির্মানের ভেতর বিশেষ নিয়মও দেখলাম। দেখলাম ছাড়া ছাড়া লাইন বা এক লাইনেও কবিতা। এর অর্থ কী ? আমরা জানি গ্যাপ সৃষ্টি করে কবিতাকে অনেক বড় করে তোলার একটা কায়দা আছে। আলী আফজাল খান এই গ্যাপটা কিন্তু হের্মেনেত্য ছাড়াও গোটা বই এর অন্ততঃ ৪৬ পাতায় ব্যবহার করেছেন। এন্টিম্যাটার বইটি পড়ি আর ভাবি। ভাবান কবি নিজে। এটিই তার গুণ। অপাঠ্য নয়। অর্থ বোঝা যায় না এমনও নয়। তবে প্রতিটি কবিতা হচ্ছে চকচকে ঝকমকে ধারালো। হের্মেনেত্য তো অতুলনীয় সৃষ্টি। আমি পোষ্টমর্ডান বা এন্টিম্যাটার এর দরজা না মাড়িয়েই বুঝলাম এখানে কবিতায় আলাদা ব্যাপার স্যাপার আছে। সেটা কি রকম ? এই দেখুন তার ” সময় ও সম্পর্ক “কবিতা। পড়ে উলটে পালটে দেখলাম সহজ ভাষার ও ভাবের লেখা। নিচে থেকে উপরে গেলে অতি সাধারণ মান। অথচ কবি আলী আফজালের হাতে পড়ে হয়ে গেলো অসামান্য কবিতা। পৃষ্ঠা – ৫০। আবার দেখি পৃষ্ঠা ২৬ এ তার কবিতা “বর্তমান পুরাণ “। প্রথম লাইনেই হোচট খেলাম. “এই এপিটাফে ফুল দেয়ারও কেউ নেই”। এরপর কি আর লাইন লাগে? এ এক পূর্ণ কবিতা। তারপরও কিন্তু কবিতায় গ্যাপ মোচড়সহ দশটি লাইন আছে। কবিতাটির শেষ লাইন দুটি।তার আগে একটা গ্যাপ- “আর এইসব মৃত তারাদের গায়ে লেগে থাকে মানুষের কংকাল / রিফ্রেস- নিউফোল্ডার – রিলোড”। আপনি উল্টো করে পড়লেও এ লাইনটি গদ্যে পাবেন। অর্থটা অনেক সহজ হবে। এ কবিতার আরেক গ্যাপে দুটি লাইন আছে -”ইতিহাস তুমি নতুন করে লিখ / লখিন্দরকে বাঁচাতে এযুগে বেহুলা আসেনা” এখানে তিনি যতি চিহ্ন দেননি। অথচ লাইন দুটি প্রায় সত্য হলেও অনিত্য।
পৃষ্ঠা ২৪, কবিতা “গোলোকায়ন ” -এ কবি লিখেছেনঃ- পূর্ব – পশ্চিমে বিভক্ত নয় /পৃথিবীটা গোলাকার”। এরপর গ্যাপ দিয়ে লিখলেনঃ- ” পূর্ব – পশ্চিম দ্বৈত্য চিন্তা যুগল ছেড়ে কেবলা তাই চড়কিতে চড়ে” কবিতা এ চারটা লাইনেই। শেষে যতিচিহ্ন নেই। সোজাকরে ভাবলে একটা সত্য কিন্তু অনিত্যকে কবি এখানে প্রকাশ করেছেন। তবে এখানে তার গানিতিক চেতনার একটা ইশারা আমরা পেয়ে যাচ্ছি। যা পোষ্টমর্ডানকবিতার ধর্ম।
এবার আরেক আলী আফজাল খানকে দেখুন এন্টিম্যাটারের ৫৪ পৃষ্ঠায়। কবিতার নাম ‘অস্ত্র হস্তান্তর’। কবি অভিজ্ঞতা থেকে নয় , চেতনালব্ধ চর্চা থেকেই লিখেছেন এ কবিতা। তিনি এখানে তাঁর কবিতায় কিভাবে এ দেশের ডিসেম্বর ও মাটি মানুষকে উপস্থাপন করলেন? “ডিসেম্বরের শীতল বাতাস শুধু তীব্র হয় /স্নায়ু ও শিরায় ছমছম ব্যথা ও আক্রোশ /স্মৃতি মেথ , পেশল হাত নীল হয়ে আসে /আঁধার নামে অস্তিত্বের পরিধির প্লাটফর্মে /সোনালী রোদ সুদূর পরাহত। “। এরপর একাত্তরের যুবকের যে কাব্যিক বর্ণনা , তাদের জীবন ও দেহের বর্ণনা , ক্ষুধা , সম্পর্ক , নারী ও ভেতরের বোধ পাঠককে চমকে দিতে পারে। এখানে মাটির মতো স্তরে স্তরে সাজানো দৃশ্যপট, লুট ও পুঁজির কাছে মুক্তিযোদ্ধার পরাজয় তিনি নিপুনভাবে বর্ণনা করে শেষে শিশুদের জন্ম ও ভবিষ্যতের হাতে যুদ্ধ হস্তান্তর করেছেন। কবিতায় পরতে পরতে দৃশ্যপটের কাব্যময়তা আমি কবির প্রথম গ্রন্থে দেখেছি। প্রথম বই এর কিছু আবেগ তিনি এখানে পরিত্যাগ করতে পারেন নি। তা তার কাব্য সুষমাকে আরো দৃঢ় করেছে। ৫৫ পৃষ্ঠার কবিতা ‘ব্রাত্যজন’ এ কবি আরো কিছু দৃশ্যের অবতারণা করেছেন যা চিরন্তণ ও নিত্য।
বিশ্বায়নের কবি আলী আফজাল লিখেছেন `কাঁটাতার’ নামের একটি কবিতা। “পাখীদের কোন দেশে ভিসা লাগে না, পৃথিবী দেশ মানুষেরও ছিল” অপূর্ব বারবার পঠনযোগ্য লাইন। তারপরে তিনি লিখলেন আরো কষ্টের লাইন “গর্ভধারিনীর বুকে ক্ষমতার গজাল/ আর আমার/ বাসা বাড়ি, জিরো পয়েন্ট/ যে কোন দেশ, যে কোন কাল/ শিশিরে পা ফেলবো . গুলি “। এভাবে কবি কবিতার বিস্তার ঘটিয়ে শেষে লিখলেনঃ- “সীমান্তের কাঁটাতার উপহাস করে মানবতাকে/ মানুষের শরীর না কাপড় শুকানো সীমান্ত পিলারে?” সাথে সাথে মনে পড়ে যায় একদা সংঘটিত এক বাংলাদেশী দুর্ভাগা তরুণীর সীমান্ত অতিক্রমকালে গুলি খেয়ে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফ্যালানীর লাশ। এভাবে কবি আলী আফজাল খান তার কবিতার পরিধিকে প্রসারিত করেছেন। প্রত্যেকটি লাইন একেকটি দৃশ্যের অবতারণা করে আর করে একেকটি ভিন্ন চিন্তার।
এবার দেশপ্রেমিক মানুষ আলী আজফাল খান তার পরিচয় এ গ্রন্থের “পরিচয়” কবিতায় তুলে ধরেছেন নিপুনভাবে। “লাল সবুজ শাড়ীর গর্ভে জন্মেছি মাগো /আমি তোমার আদম সন্তান ” এরপর তিনি বাংলার মানুষের সারে চার হাজার বছরের রক্তের জাতক ইতিহাসকে টেনে, ধর্মাধর্ম ছিন্ন করে বাঙ্গালী জনতার কাতারে শাহবাগে দাঁড়িয়েছেন। জয় বাংলা শ্লোগান দিয়েছেন কবিতায় এবং আমি জানি প্রজন্ম চত্তর তৈরিতে তার অবদান কতোটুকু। অতএব এখানে কবি প্রতিবাদী , আত্মপরিচয় বয়ানকারী একজন খাঁটি বাঙ্গালী যার ভাষা বাংলা এবং যিনি বাংলায় কবিতা চর্চাকারী কবি বটে। এখানেই কি থামলেন ? তিনি লিখলেন “প্রজন্ম ” ও “কবি মেহেরুন্নেসার লক্ষ লক্ষ ছিন্ন মাথা শাহবাগে।” এ কবিতা দুটি ব্যতিক্রমী বিপ্লবী কবির কবিতা যার সাথে এন্টিম্যাটার এর মূল সুরের কোন যোগসূত্র নেই। একই সুরে বাঁধা আছে আরেকটি কবিতা তার -”চেতনা ২০১৩”। এ চারটি কবিতা মুক্তিযুদ্ধ , বাঙালী সত্বা ও একে রক্ষার সংগ্রামে কবি নিজেকে কবিতা ও স্বশরীরে ধারণ করেছেন, পোষণ করেছেন এবং লালন করে চলেছেন। এ ছাড়া তানজিন পোষাক কারখানায় পোড়া শ্রমিকদের নিয়ে লেখা তার আরেকটি কবিতা এখানে গ্রথিত আছে। নাম “১১০ জন মানুষ ও ১৫ কোটি লাশ “। এখানে তিনি শ্রমিকনেতা, বুদ্ধিজীবী ও বিবৃতিদাতাদের চিতকারকে ক্লীব বলেছেন। এই লাশের উপরই একটা বিপ্লবের সূচনা হতে পারতো। কিন্তু ক্লীব শ্রমিক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের ক্লীবত্বের কারণে ১১০ জন মানুষের মৃত্যুই বৃথা গেছে। কবি ব্যথিত। কিন্তু প্রতিবাদী। কিন্তু এখানে সাভার ট্রাজেডীকে তিনি খাটো করে দেখে কিছুই লিখলেন না। এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এবার কবি আলী আফজাল খানের আরেকটি কীর্তির কবিতা বয়ান করি। কবি এর আগেও এ কাজটি করেছেন। তার ভেতরটা পুরো মাত্রায় গ্রামীণ এবং বাউল। নাগরিকতা তার লেখাপড়াকে ছুঁয়েছে। আধুনিক পোষ্টমর্ডান গ্রুপে ঢুকে সেখান থেকে চিন্তাকে শানিয়েছেন। পড়েছেন বিস্তর। তার প্রতিধ্বণিই হচ্ছে কবির কবিতার সুর ও স্বর। তবু তিনি তার ভেতরে জাগ্রত মরমী টানকে অস্বীকার করতে পারেন নি। বিনির্মান তত্বের আশ্রয়ে প্রথম গ্রন্থে `শব্দের বাড়ি শব্দের শাড়ি’ সিরিজ লিখেছিলেন। এখন এন্টিম্যাটারে এলো তরজা জাতীয় পালাগানের কবিতা “তরজাঃ জোছনা মায়া”। এ ধরনের কবিতায় দুজন কবিয়াল লাগে। প্রথম জন যা বয়ান করেন তাকে বলে “চাপান” আর পরের অংশে উত্তর যিনি দেন তার অংশের নাম “উতোর”। এখানে চাপানে আছে জোছনা আর উতোরে আছে মায়া। এই নিয়ে কবিতার নাম জোছনা মায়া। কবিতাটিতে গীতিময়তা আছে। “জীবনানন্দরের বনলতা হতে চাইনি / চাইনি হতে রবি ঠাকুরের শেষের কবিতা”। এমন সুন্দর গীতিময় ১৯ লাইন দিয়ে লেখা চাপান অংশ। কিন্তু উতোরে গিয়ে দেখি পুরোই উল্টো পালটা ব্যাপার। মায়া বলছেন পুরো পোষ্টমর্ডান ভাষায় “নাভি থেকে নেমে হেটে যায় রেটেল স্নেক /পরজীবী বন্ধু ভ্রুণ /রক্ত শুষে দাড়িয়ে গেছে ফনা তুলে” – উতোরের প্রথম পংতি। এই হলো তরজা কবিতার বিনির্মান। যা কবি আলী আফজাল খান সুচারুরূপে সম্পন্ন করলেন। এবং একটি পুরানো রীতির গীতি কবিতাকে এনে ফেললেন বিনির্মানের কুঠরিতে। এটা কি কম পাওয়া। এখানে অবশ্যই কবিকে একটা বাড়তি অভিনন্দন দিয়ে রাখলাম।
ক্রনস নামে এ গ্রন্থে একটা কবিতা সংযোজিত হয়েছে। পৃষ্ঠা-১১। এখানে প্রথম লাইনটা দেখুনঃ “পুতুল জীবনে ক্যামন আছো মানুষ ?” এ লাইনের পর কবি ক্রমশঃ তার রাগের মাত্রা বাড়িয়ে নবম লাইনে তিনি লিখেন . . .” বেফাঁস লেজটাও পায়জামা থেকে বেড়িয়ে যায় “খুব সম্ভব ওটা বেরিয়ে যায় হবে। তার পরও দেশি চালু ভাষায় সেন্সরহীন কথা তিনি বহুত লিখেছেন। এটা কবির এক ধরনের স্টাইল। তিনি এই রকম ভাবে “তালাশঃ পড়ে থাকি কংক্রীটের আর্তনাদে” (পৃষ্ঠা ১৫) কবিতাকে একটি সেন্সরবিহীন কবিতা ঘোষণা দিয়ে লিখেছেন “ক্ষমতাকেন্দ্রের এ বাহাস প্রান্ত মানুষ বাল দিয়েও পুছে না ” আরেক লাইনে লিখেছেন “কেউ তো ন্যূয়ে যায়, কেউ ধ্বজভঙ্গ / পুঁথিচোদা আবালেরা সপ্রসন্ন ঘুমাক”, এগুলো কবি আলী আফজাল খানের নানা নিরীক্ষার কিছু অংশ। তিনি তার এই ৬৪ পৃষ্ঠার ৪৯ টি শিরোনাম এর কবিতায় নিরীক্ষা করেছেন অন্ততঃ সাতরকম। ভাব , ভাষা , বিষয়কে নানা ভাবেই উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন পোষ্ট মর্ডান কবিতা লিখনে তার মুন্সিয়ানা। তার একটি কবিতার নাম “চান্নি রাইতে জোছনা দেহি অমাবশ্যার কালা পোলা” (পৃষ্ঠা ৯) পুরো কবিতাটা দিচ্ছিঃ
“জলে তোমার জলছবি
কতটা সত্য ?
সিথানে তোমার নাকছাবি
কতোটা মিথ্যে ?
শব্দের ধোঁয়াকে বলি
এই তো নিরঞ্জন ”
এখানে নিরঞ্জন কে আসলে ? কবির চোখে ধোঁয়া। এ ধারার আরেকটি কবিতা আছে তার। নাম “ত্রিজলে” (পৃষ্ঠা ৪৯) পুরো কবিতাঃ
“এক জলের আলোড়নে তীর ভাঙ্গে
সীমা ভেঙ্গে গ্রাসে পলি
আর এক গভীর মন্থনে নেমে যায় ভূতলে
গভীর ভাঙ্গনে ভাঙ্গে নিজের গর্ভ
এবং জলের ফেনায়
ভাসে আর এক জল
জলের গঠন বাঁধা আছে স্থলের ফ্রেমে”
বইটি পাঠ করতে গেলে পাঠক দেখবেন অতি সহজ ভাষায় কবিতা লেখার কিছু টোটকা ব্যবহার করে কবিতাকে নিত্য নিরীক্ষার মাধ্যমে কবি করে তুলেছেন ক্ষুরাধার। তিনি সমাপীকা ক্রিয়া ও যতিকে যথা সম্ভব দূরে রেখেছেন। প্রচুর স্পেস তৈরি করে তিনি গড়েছেন অনেক গুপ্ত কথার ছোট কবিতা। তিনি তার প্রবন্ধে সম্প্রতি পোষ্ট মর্ডান কবিতার ভাষা বিষয়ে সুগভীর পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন শত মনীষির কথার ইঙ্গিত দিয়ে। ভিন্নচোখের ভাষা সংখ্যা এবং লিটল ম্যাগ আক্ষরিক এর চতুর্থ বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা ১৪২১ এ লিখেছেন ব্যাপকভাবে। তার পুরো বইটি পড়তে গেলে কবির ভাষায় ওগুলো পড়া জরুরী। আমি খুব পুরানো মানুষ। কবিতাকেই আমি পড়ি। নানাভাবে দেখি। কবি আলী আফজালকে পড়তে পড়তে তার ভাষাটাও আমার জানা। নানা মত, নানা জট, নানা পট থেকে যা পেরেছেন, নিয়ে কবিতা লিখেছেন। আমি কেবল তার ভেতরে খুঁজি সৌন্দর্য ও নতুনত্ব। এন্টিম্যাটারে কবি সেটির পুরো মাত্রায় বিকাশ ঘটিয়েছেন। ঘাম ও কবিতা থেকে মেদ দুটোই ঝরিয়েছেন সমানে। তাই আলী আফজাল খানের কবিতাগ্রন্থ ‘এন্টিম্যাটার’ মেদহীন এবং পূর্ববর্তী থেকে আলাদা হতে পেরেছে। আমি পড়ে দেখেছি। আপনারা পড়লে আরো ভালো বুঝবেন। কারণ আলী আফজাল খানের কবিতা চর্চার আরম্ভটাই অন্যরকম পরিবেশে ও কালখন্ডে ঘটেছে যাকে আমরা সমকাল বলতে পারি। ‘এন্টিম্যাটার’ যতো পড়বেন, পোষ্টমর্ডান কবিতাকে ততো বেশি ছুঁতে পারবেন এটা আমি বলতে পারি।
তাহলে আলী আফজাল খানকে কি আমি নিখুঁত কবি বানিয়ে দিলাম। দিলাম বটে। বাংলা সাহিত্যে পোষ্টমর্ডান কোন ধারা নয়। এটি এদেশে ১৯৯৫ এর দিক থেকে চর্চিত হয়ে এখন তো প্রায় শেষের দিকে চলে যাচ্ছে। আরো দিক দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। তার আগে চিরন্তণ কবিতা ধারা সমানে আরো বেগে বহমান। সেখানে কি আলী আফজাল খান আছেন ? এক কথাতে তিনি সেখানে নেই। তিনি যেখানে সবল সেকারণেই সকলখানে দুর্বল তিনি। তবু আমাদের নিটোল পোষ্টমর্ডান কবির প্রয়োজন এবং এখানে তিনি অদ্বিতীয়। এখানেই তার ঘর বিছানা ও সংসার। যুগ যুগ জিও কবি আলী আফজাল খান।

