বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কারণে-অকারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দীর্ঘদিনের। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার আমলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আস্ফালন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিলো। বিগত ১৭ বছর মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা কর্মকর্তাদের ক্ষমতার দাপটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন অধিদপ্তর কিংবা পরিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারিরা। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর অত্যন্ত কার্যকর একটি সংস্থা। বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার বলা হয় এলজিইডিকে। অথচ নানা কারণে এলজিইডির সুনাম আজ প্রশ্নবিদ্ধ। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কিংবা প্রকৌশলীরা এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত খবরদারির অভিযোগ তুলেছেন দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু বিগত স্বৈরশাসকের আমলে এ নিয়ে প্রকৌশলীরা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে সাহস পাননি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যে আদেশ দিতেন তাই পালনে বাধ্য করা হতো এলজিইডির প্রকৌশলীদের। নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রকল্প পরিচালকদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বহুদিন থেকে। কথায় কথায় প্রকৌশলীদের কাছ থেকে প্রকল্প কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখানো হতো। আবার মন্ত্রণালয়ের কারো সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হলেই জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রত্যাহার করা হতো। ছোটখাট অভিযোগে লঘু দণ্ড না দিয়ে গুরু দণ্ডের ভয় দেখানো হতো। অর্থাৎ মোড়লীপনার দাপট দেখিয়ে জিম্মী করে রাখা হতো স্থানীয় সরকার প্রকৌল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উর্ধ্বতন প্রকৌশলীসহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারি প্রকৌশলী, উপ সহকারি প্রকৌশলী এবং অন্যান্য কর্মচারিদের। ক্ষেত্রে বিশেষ বিভাগীয় পর্যায়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কিংবা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের হয়রানিও করতেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোন কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। তারা বিগত স্বৈরশাসকের আমলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের পোস্টিং দিতেন। আবার বনিবনা না হলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের প্রত্যাহার করা হতো। এ ভাবে প্রকৌশলীদের আতঙ্কে রেখেই ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত থাকতেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। বাধ্য হয়েই মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের শোচনীয় পরাজয়ের পরেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ঐ দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতালোভী এবং স্বেচ্ছাচারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কােন পরিবর্তন আসেনি। তারা এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন পোস্টিং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার একান্ত সচিব মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখায় কর্মরত যুগ্ম সচিব মোঃ সামছুল ইসলামের নাম বর্তমানে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে মাঠ পর্যায়ে প্রকৌশলীদের পদায়নের ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকেও আমলে নেন না। এই দুই কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার নাম ভাঙ্গিয়ে বদলী বাণিজ্যে নেমে পড়েছেন। জানা গেছে, সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফের একান্ত সচিব মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বিগত স্বৈরশাসকের অন্যতম দোসর পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আযমের একান্ত সচিব হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় সরকার উপমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের একান্ত সচিব হিসেবে উক্ত নাছির উদ্দিন দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তাজুল ইসলামেরও একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত। বহুমাত্রিক চরিত্রের অধিকারী স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার বর্তমান একান্ত সচিব মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন সব সময়ই থাকেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। শুধুমাত্র তিনি রং পাল্টান, থাকেন সুবিধাজনক স্থানে। সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার নাম ভাঙ্গিয়ে তার এই একান্ত সচিব এলজিইডিতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। ফলশ্রুতিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মোঃ সামছুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও বদলি বাণিজ্যে নেমে পড়েছেন। ৫ আগস্টের পর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত প্রকল্প পরিচালকদের রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে ব্লাকমেইলিং করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ এই দুই কর্মকর্তা মিলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী ‘বদলি বাণিজ্য’ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এ বিষয়ে যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মোঃ সামছুল ইসলামের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কয়েকবার যোগযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার একান্ত সচিব মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের সঙ্গে গতকাল রাতে তার মোবাইলে বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে নিয়ে কথা হলে তিনি স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাকে অবহিত করবেন বলে জানান। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

