নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থানের অভাব আর উন্নত জীবন- এ তিন চাহিদার কারণে বিদেশমুখি হচ্ছে বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে তারা দেশেও ফিরছে না। বরং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন অনেকে। ফলে দেশের সন্তানদের এ মেধা কোনো কাজে আসছে না বাংলাদেশের। তবে এ সংখ্যা ঠিক কতো- সে পরিসংখ্যান জানা নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তাদের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৭০০ থেকে এক হাজার। যদিও বাস্তবিক অর্থে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউজিসির ৩৯তম বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সেরা সদ্য স্নাতক শিক্ষার্থীরাই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার জন্য বেশি দেশ ত্যাগ করছেন। প্রতিবছর এ সংখ্যা ৭০০ থেকে এক হাজারের মতো। এসব শিক্ষার্থীদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, জাপান, জার্মানি, চীন, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স। পছন্দের তালিকাতে রয়েছে স্কান্ড্যাভিয়ান দেশগুলোও। কারণ পড়াশোনার জন্য এসব দেশে খরচ লাগে না। সেই সঙ্গে জনসংখ্যা কম হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগও বেশি।
ইউজিসির একটি সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর সরকারি পর্যায়ে প্রায় ২০০ ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী দেশ ছাড়ছেন উচ্চশিক্ষার জন্য। তাদের বেশির ভাগই দেশে ফিরে আসছে না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশ ছাড়ছেন শিক্ষকরাও। তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গিয়ে আর দেশে ফিরছেন না।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের উচ্চশিক্ষার বেশ ঘাটতি রয়েছে, এটা সত্য। আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না। এ কারণে আমাদের দেশের মেধাবীরা এ দেশকে উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না। ফলে তারা বিশ্বের নানা দেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। সেখানকার উন্নত জীবনের জন্যই অনেকেই আর দেশে ফিরে আসছেন না।’
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘দেশে তাদের চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নেই। ভারত, চীন, জাপানের প্রচুর শিক্ষার্থী প্রতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। কিন্তু দেশে চাকরি ও উন্নত জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় তারা আবার ফিরেও আসছেন।’ তবে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কথা চিন্তা করে অনেকেই আবার দেশে ফিরতে পারেন বলেও মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার বিষয়টিকে উৎসাহ দিতে হবে। তবে তারা যেন পড়াশোনা শেষ করে আবার দেশে ফিরে আসে, সে পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে। মূলত অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে আসছেন না শিক্ষার্থীরা। এসব মেধাবীরা দেশে ফিরে না আসাটা দেশের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন আলমগীর হোসেন। বর্তমানে সুইডেন প্রবাসী। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কোর্স শেষ হয় না। আর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জীবনের নিরাপত্তাও নেই। এ কারণে বিদেশে আসা এবং এখানেই থেকে যাওয়ার চিন্তাভাবনা।’
একই প্রসঙ্গে কথা হলো বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র বাঁধনের সঙ্গে। বললেন, ‘বাবা-মা ও আমার স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেই থেকেই এখানে পড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। আমি এখন প্রতিনিয়ত চাকরি নিয়ে ভাবি। প্রায় সারাদিনই ইন্টারনেটে বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবেদন করার উপায় দেখি। কারণ এ দেশে থাকা সম্ভব নয়। যে দেশে রাজনীতিবিদদের মর্জিতে সবকিছু হয়, সেখানে কোনোকিছুই করা সম্ভব নয়।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করে চাকরি খুঁজছেন শরীফুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি চাকরির জন্য নিয়মিত পরীক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু চাকরি হচ্ছে না। আমি অনার্স-মাস্টার্স দুটোতেই ফাস্ট ক্লাস পেয়েও চাকরি পাচ্ছি না। অন্যদিকে কোটাওয়ালাদের ও দুর্নীতিবাজদের মেধা না থাকলেও টাকার জোরে তাদের চাকরি হচ্ছে। যারা পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস করে, ঘুষ দেয় তাদেরই কেবল চাকরি হচ্ছে। এখানে মেধাবীদের জায়গা নেই। আমার যেসব বন্ধু বিদেশে গিয়ে আর দেশে না ফেরার চিন্তা করছে, তাদেরকে আমি সাধুবাদ জানাই। দরকার নেই এই দুর্নীতি আর হানাহানির দেশে ফেরার।’
এদিকে প্রতিবছর কী পরিমাণ শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায় এবং তাদের মধ্যে কতজন ফিরে আসে না, সে বিষয়ে ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো হিসাব নেই। এক যুগের অধিককাল ধরে এ হিসাব রাখা বন্ধ রয়েছে। এর কারণ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, আগে হিসাব রাখা হলেও এ নিয়ে অবৈধ ব্যবসা গড়ে তোলে একটি সিন্ডিকেট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। ওই চক্রের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তাও জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো ছাত্রছাত্রীদের হিসাব রাখে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বিশেষজ্ঞ (পরিসংখ্যান) শেখ মো. আলমগীর বলেন, ‘বিদেশে কি পরিমাণ শিক্ষার্থী যাচ্ছে, আমরা সে বিষয়ে একটি পরিসংখ্যানের কাজ শুরু করেছি। এটা আসলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে করতে হচ্ছে, সেজন্য কিছু সময় লাগছে।’

