বিগত সরকারের পতনের পর সম্প্রতি আওয়ামী মদদপুষ্ট পাওয়ার গ্রিডের এমডি এ কিউ এম গাউছ মহিউদ্দিনকে অপসারণ করা হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পাওয়ার গ্রিডে এখনও বহাল তবিয়তে আছে বেশ কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ও ধান্দাবাজ প্রকৃতির কর্মকর্তা। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী পরিচালক (প্ল্যানিং ও ডেভেলাপমেন্ট) আব্দুর রশিদ খান, যিনি বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে এমডি পদে আছেন। জানা যায়, ৫ আগস্টের পর বেশকিছু পত্রিকায় সাবেক এমডি গাউছ মহিউদ্দিনের নামে নানা অপকর্মের বিষয় তুলে ধরে তাকে অপসারণ করে নিজের এমডি হওয়ার পথ পাকাপোক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেন এ কর্মকর্তা। এমনকি এমডি পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য বিদ্যুৎ-জ্বালানী উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সাথে সখ্যতা বাড়াতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন এ কর্মকর্তা। অথচ এই আব্দুর রশিদ খানের নামে আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হওয়ার প্রচেষ্টা, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য টেন্ডার স্টেজে ফাঁস করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে এমডি পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব হাবিবুর রহমানের সাথে দেনদরবার করেন আব্দুর রশিদ খান। পাওয়ার গ্রিডের এমডি পদে আব্দুর রশিদকে প্রথম করানো ছাড়াও সাবেক বিদ্যুৎ সচিব মহাদুর্নীতিবাজ হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ঢাকা ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) এর নিয়োগ পরীক্ষায় নিজের মেয়ের জামাই ও ডেসকোর সাবেক এমডি কাওসার আমির আলীর ছেলেকে অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। পাওয়ার গ্রিডে রয়েছে আব্দুর রশিদ খানের দুর্নীতির সহযোগী এক সংঘবদ্ধ চক্র। পাওয়ার গ্রিডের কন্ট্রাক্ট দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাবস্থায় এই চক্র গড়ে তুলেন তিনি। নিজের চক্রের কর্মকর্তাদের পারফরমেন্স ইভালুয়েশন এ অধিক নাম্বার প্রদান, অধিক বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করতেন তিনি। ২০২০ সালে তার অধীনস্ত এক কর্মকর্তা নাসফুল হুদা প্রিন্সকে তিনি অস্বাভাবিক বেশী নাম্বার প্রদান করায় হিউমেন রিসোর্স দপ্তর থেকে তদন্তপূর্বক তা সংশোধনও করা হয়। আব্দুর রশিদ খানের আরেকজন আস্থাভাজন কর্মকর্তা হচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ূন রশিদ। হুমায়ুন রশিদ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের আত্মীয় ও তার বাবা একজন সাবেক আমলা। পাওয়ার গ্রিডে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রমোশনেই তিনি অনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, সহকারী প্রকৌশলী পদে লিখিত পরীক্ষায় নূন্যতম নাম্বার অর্জন না করা সত্ত্বেও তিনি পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ পান। সর্বশেষ ২০২১ সালে পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য হুমায়ূন রশিদ, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শাহজাদা জুয়েলসহ বেশ কিছু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিবর্গ তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি, মন্ত্রী ও আমলাদের দ্বারা তদবির করে প্রমোশন বাগিয়ে নেন। অথচ পদোন্নতি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা সত্ত্বেও সেই ব্যাচের অনেক মেধাবী প্রকৌশলী প্রমোশন বঞ্চিত হন। রশিদ চক্রের অন্যান্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইফতেখারুল আমিন প্রমূখ। এদের প্রত্যেকের নামেই ঠিকাদরের হয়ে ড্রয়িং-ডিজাইন প্রস্তুতকরন, ঠিকাদারের দরপত্র প্রস্তুতকরণে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে যা সার্ভিসরুলস অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। জানা গেছে, এদের যোগসাজশেই পাওয়ার গ্রিডের বিভিন্ন প্রকল্পে কোন ঠিকাদার কাজ পাবে তা নির্ধারিত হতো। তবে ২০২১ সালে আব্দুর রশিদ খানকে প্রধান প্রকৌশলীর (পিএন্ডডি) দপ্তর থেকে বদলি করা হলে তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (এইচআরএম) রিয়াজ আহমেদ এই চক্রের অনেককেই বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করান। আব্দুর রশিদ খান নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডই) পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ওই চক্র পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে পিজিসিবির সহকারী প্রকৌশলী বা ম্যনেজার নিয়োগ পরীক্ষা, বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে হয়ে আসলেও সম্প্রতি আব্দুর রশিদ খানের বন্ধু নির্বাহী পরিচালক (এইচআরএম), আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে পাওয়ার গ্রিডে নিয়োগ সেল নামক নিয়োগ বাণিজ্যের এক অভিনব পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। নিয়োগ সেলের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়োগ পরীক্ষায়ই এর প্রশ্নপত্রের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলো। নিয়োগ সেল গঠনের বিষয়ে কর্মকর্তারা আপত্তি তুললে আব্দুর রশিদ খান দাবি করেন, ইদানীংকালে বুয়েটের করা প্রশ্নপত্র মান সম্পন্ন হচ্ছে না, তাই নিয়োগ সেলের মাধ্যমে প্রিলিমিনারি প্রশ্ন করানো হচ্ছে!
জানা যায়, আব্দুর রশিদ খান ছিলেন পাওয়ার গ্রিডের আওয়ামী চক্রের অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি। তাই প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসবে অতিরিক্ত দায়িত্ব নেয়ার পরও আব্দুর রশিদ খান পিজিসিবিতে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টিকারি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং ঐ পরিষদের সদস্যরা এখনও পাওয়ার গ্রিডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে স্বপদে বহাল আছেন; এমনকি কেউ কেউ পদোন্নতির জন্য বিভিন্ন মহলে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। ঐ পরিষদের উল্লেখযোগ্য সদস্য হচ্ছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়জুল কবির, মিজানুর রহমান সরকার, মাহমুদুল শাকিল, কপিল ঘোষ প্রমূখ। এদের মধ্যে ফয়জুল কবির সাহেব ৫ আগস্ট সরকার পতনের সাথে সাথেই খোলস পাল্টে বিপ্লবী সাজার চেষ্টা করেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-সমন্বয়কদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। এমনকি তিনি কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোসাদ্দেক আলী ইবন মোহাম্মদকে মিথ্যা তথ্য দেয়ে পাওয়ার গ্রিডের এমডি পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য তদবির করেছিলেন। সুতরাং দুর্নীতির বরপুত্র আব্দুর রশিদ গং এবং আওয়ামী মাফিয়া চক্র বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত রাজনৈতিক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা প্রয়োজন বলে বোদ্ধামহল মনে করেন।

