সাবেক আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা চিহ্নিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বহুল আলোচিত চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান খান । গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ ছাড়াও বিআরটিসির বিভিন্ন দফতরে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চি করেছে। আইনী নোটিশে মাহবুবুর রহমান খান উল্লেখ করেন-গত বছরের ৬ জুন বিআরটিসির কনট্রাকটর (গ্রেড-ডি) ও কাউন্টার ম্যান পদে ১৪১ জন নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ অস্থিতিশীল, তখন ১৬ জুলাই উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। এরপর চলতি বছরের ১৮ জুলাই উক্ত পদে ২০০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। উক্ত প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় প্রক্রিয়াটি বন্ধ থাকে। তিনি সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রেতাত্মা, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিআরটিসি ভবনের নিচতলায় গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু কর্নার ও পাঠাগার, এছাড়াও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিআরটিসির বাসে তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার। এসব বিষয় নিয়ে ওই সময় জাতীয় একাধিক পত্রিকায় সংবাদ ও প্রকাশিত হয়। গত ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন সংগ্রামের ফলে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের দিন বিআরটিসির চেয়ারম্যান এর উদ্যোগে ভবনের নিচতলায় গড়ে তোলা বঙ্গবন্ধু কর্নার ও পাঠাগারটি রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হয় তার নির্দেশে। এছাড়াও সারাদেশের বিআরটিসির অফিস ও বাস, ট্রাকের ডিপোতে থাকা সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। পরদিন সকালেই সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার ছবি টাংগিয়ে দেন। রাতারাতি ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপি, জামায়াতের একান্ত অনুসারীর কাতারে নিয়ে আসেন।এমনকি আওয়ামী লীগের শাসন আমলে যে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাবহার করেছেন তাদেরকেই এখন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিরোধী তকমা লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে দিতে বিভিন্ন প্রকারের কূটকৌশলী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার মতামত স্বাক্ষর বহিতে স্বাক্ষর করেন। এছাড়াও সাবেক আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেতাত্মা খ্যাত সাবেক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে ফটোসেশান করে নিজেকে আওয়ামী লীগের একজন একান্ত আস্থাভাজন হিসেবে সর্বমহলে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন। গত ৭ আগস্ট রাষ্ট্র যখন সরকারবিহীন এবং সরকারি অফিস আলাদাত বন্ধ, ওই সময় পিও এল অ্যাটেনডেন্ট পদে ১০ জন, ২ জন বুকিং সহকারী ও ২ জন পিও এল সহকারীকে দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেন তিনি। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কার্যত দেশের সব দাফতরিক কাজ বন্ধ থাকার পরও এহেন পরিস্থিতিতে তিনি নিয়োগ দেন। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় প্রমাণিত হয় যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না এবং উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে নানা সময়ে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তদন্ত চেয়ে এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী মাহবুব। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের খুবই আস্থাভাজন এবং সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংবাদ মাধ্যমের সাথে ক্ষমতা প্রদর্শন, অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা কারণে তিনি বহুল আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন। গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দপ্তরের বিতর্কিত চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক কেউ বদলী, নয়তো কেউ ওএসডি হয়েছেন। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরম আস্থাভাজন এই কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তেই আছেন। এ ছাড়াও চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে, গত বছরের ২৫ অক্টোবর সংস্থাটির জেনারেল ম্যানেজার, ডেপুটি ম্যানেজার সহ ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তাজুল ইসলামের দুর্নীতি, সম্পদ ও নারী কেলেংকারীর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম এখন ঐ ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন উপহার ও মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে তাদের নো অবজেকশন জিডি করাতে নিকটস্থ থানায় চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তাজুল ইসলাম চাকুবীবিধির ভয় দেখিয়ে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের কপিতে ওই সকল কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল বলে রাজধানীর পল্টন থানার অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলাও দায়ের করান আওয়ামী লীগের প্রভাবপ্রতিপত্তি খাটিয়ে। অভিযোগ আছে, তাজুল ইসলামের দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় নামে বেনামে জমা রয়েছে কোটি কোটি টাকা। এর মধ্যে অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ইউসিবি ব্যাংক ধানমন্ডি শাখায় এফডিআর ও বিভিন্ন হিসাবে ১৮ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক পল্টন শাখায় চলতি হিসাবে ২ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ধানমন্ডি শাখায় ৯ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় চলতি হিসাবে ৭৫ লক্ষ টাকা. পূবালী ব্যাংক খুলনা শাখায় চলতি হিসাবে ৪২ লক্ষ টাকা ছাড়াও শেয়ার মার্কেটের ব্রাক সিকিউরিটিতে ৭৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। ব্যাংকে নগদ টাকা ছাড়াও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন বিপুল পরিমাণে সম্পদ ও জমি। এর মধ্যে বসুন্ধরা এম ব্লকের ২৫০০ নং সিরিয়ালে ২০ কাঠা জমি, উত্তরা ৩ নং সেক্টরের ১৮ নাম্বার রোডে ৩৯ নং বাড়ী, ধানমন্ডির ৭ নাম্বার রোডের ২৭ নাম্বার বাড়ীতে ফ্ল্যাট, কক্সবাজারের কলাতলী সড়কের পাশে ছেলে অমির নামে জমি ও ৪ টি মাউক্রোবাস, এনা পরিবহনে ৩ টি এসি বাস, কুমিল্লায় একটি খামার বাড়ী ও মাছের ফার্ম রয়েছে তার। অভিযোগ থেকে আরো জানা যায়, তাজুল ইসলাম ২০২১ ইং থেকে ২০২৩ এর ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অবৈধভাবে প্রায় ১৩০০ জন লোকবল নিয়োগ দিয়েছেন। এই নিয়োগ থেকে তিনি প্রায় ৮ কোটি টাকা ঘুষ বাবদ নিয়েছেন। অভিযোগপত্রে এই অবৈধ নিয়োগের প্রমাণ স্বরূপ জনৈকা নুসরাত জাহান ও ইসরাতের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে। তারা প্রথম নিয়োগ পায় কন্ট্রাকটর ডি হিসেবে। ২য় নিয়োগ লাভ করেন ২৬ জানুয়ারী ২০২৩ এ জব সহকারী হিসেবে। এদের একজনকে সহকারী নিজারত কর্মকর্তা ও আরেকজনকে কল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে ৩য় বারের মতো নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া রাশেদ খান নামে আরেকজন চাকুরী প্রার্থী অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে ২৩ মে ২০২৩ এর লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেও ৫ম স্থান প্রাপ্ত হন। এমনকি ব্যাবহারিক পরীক্ষার সময় অসদুপায় অবলম্বনের জন্য মন্ত্রণালয়ের লোকজন কর্তৃক আটক হলেও চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের ভাগ্নী জামাই হওয়ার সুবাদে পুলিশে সোপর্দ না করে রাশেদ খানকে ছেড়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়। এ ছাড়া অভিযোগ থেকে আরো জানা যায়, ২০২১ ইং থেকে ২০২৩ ইং এর ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়সহ সমস্ত ডিপোতে তার নিজস্ব লোকবল দিয়ে টেন্ডার ছাড়া কাজ করানো হয়েছে। তার সব কাজই করানো হয় মেসার্স আল মালিক ট্রেডার্স, এম.এইচ এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স অনন্যা ট্রেডার্সের মাধ্যমে। এর বাইরে কেউ কাজ পায়না শত চেষ্টা করেও। এদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম এযাবৎ প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ঘুষের অর্থ তার ছেলে অমি’র ফার্স্ট সিকিউরিটি ও স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের একাউন্টের মাধ্যমে ঠিকাদার মোঃ নজরুল ও জামানের ব্যবস্থাপনায় পাঠানো হয়ে থাকে। এছাড়া অভিযোগপত্রে তার নারী কেলেংকারীর বিশদ তুলে ধরা হয়েছে। জি এম ফাতিমা ও নুসরাত জাহান এবং ইসরাতের সাথে তাজুল ইসলামের অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিন যাবত। তার পূর্বের চেয়ারম্যান বিদায়কালে বিআরটিসির তহবিলে ডিপোজিট হিসেবে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা রেখে যান যা বর্তমানে তাজুল ইসলামের সময় মাত্র ১৪ কোটিতে এসে নেমেছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আরো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে। জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোঃ গোলাম ফারুকসহ আরো ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রটি ২৫ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়ে। এরপর বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে অফিস চলাকালীন সময়ে তার লালিত পালিত বিআরটিসির ১৫/১৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাবহার করে মতিঝিল এলাকায় সাংবাদিকসহ কয়েকজনের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা পল্টন থানায় মামলা করতে গেলে বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম তার অধিনস্থ গোপালগঞ্জ এলাকার শেখ সেলিম, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ মিরপুর ডিপো ম্যানেজার জামানকে দিয়ে একটি জিডি করান (বর্তমান বরিশাল ডিপো ম্যানেজার) এবং কল্যাণপুরের ডিপো ম্যানেজার বুলবুলকে দিয়ে একটি অজ্ঞ্যাতনামা আসামি করে সাইবারক্রাইম আদালতে একটি মামলা করান। মামলাটি এখনো সিআইডিতে আছে। পল্টন থানার মামলা টর অধিক তদন্তের জন্য পিবিআইতে আছে। মামলা দুট গোপালগঞ্জ এলাকার কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে করানো হয় শুধুমাত্র চেয়ারম্যানের সকল অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার জন্য। এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

