সরকারি চাকরিজীবী হয়েও সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণের অভিযোগে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদফতরের চার কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৃত ব্যক্তিদের আড়াল করতেই পাসপোর্টের ‘টার্গেটেড’ ব্যক্তিদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুদকের উপ-পরিচালক মো: হাফিজুলইসলামবাদীহয়ে এ মামলাটি দায়েরকরেন। অন্য বিবাদীরা হলেন, ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের তৎকালিন পরিচালক মো: ফজলুল হক,পরিচালক মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, বর্তমান পরিচালক মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বেনজীর আহমেদ পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপির পদমর্যাদায় র্যাবের মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার পদে দায়িত্ব পালনের সময় পাসপোর্টের আবেদন পত্রের প্রফেশনের জায়গায় সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জালজালিয়াতি-প্রতারণার আশ্রয় নেন। তিনি মিথ্যা তথ্যের আশ্রয় নিয়ে‘প্রাইভেট সার্ভিস’উল্লেখ করে বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়া মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ও ই-পাসপোর্টের (ইলেট্রনিকপাসপোর্ট) জন্য আবেদন করেন।
অন্য বিবাদীরা বেনজীর আহমেদের দাফতরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থেকেও বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংগ্রহ ও যাচাই না করে স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে পরস্পর যোগসাজশে অপরাধমূলক অসদাচরণ করেছেন। আসামিরা বেনজীর আহমেদের নামে সাধারণ পাসপোর্ট, ই-পাসপোর্ট (ইলেক্ট্রনিকপাসপোর্ট) ইস্যুর জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে দন্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এজাহারে আরো বলা হয়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। পরে ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ জেলায় বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন।তিনি ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের আওতায় বসনিয়াতে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০০২ সালের জুলাই থেকে ২০০৩ সালের জুন পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় কসোভোতে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে চীফ অব মিশন ম্যানেজমেন্টঅ্যান্ড সেকশনে (পি-ফাইভ/ভি) ২০০৮ সালের ২ মে থেকে ২০০৯ সালের ১০ মে পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। তিনি ডিএমপি কমিশনার (অতিরিক্ত আইজিপি) হিসেবে ২০১০ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং র্যাবের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি) হিসেবে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে আইজিপি পদে যোগদান করেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতরে আইজিপি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এদিকে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের ‘পাসপোর্ট জালিয়াতি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৃত ব্যক্তিদের বাদ দিয়েই দুদক মামলা করেছে বলে জানা গেছে। সংস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে এ তথ্য। সূত্রটি জানায়, বহির্গমণ ও পাসপোর্ট অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ ও জালিয়াতি সিন্ডিকেট হোতাদের কৌশলে আড়াল করতেই অদৃশ্য ইশারায় যেনতেন ভাবে গতকাল দায়ের করা হয় এ মামলা।
সূত্র মতে, বেনজীর আহমেদ কখনোই অফিসিয়াল পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। সব সময় তিনি সাধারণ পাসপোর্টই ব্যবহার করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা জেনেও তাকে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করার ঘটনাটি প্রথম ধরা পড়ে ২০১৮ সালে। এ সময় পাসপোর্ট অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ছিলেন এটিএম আবু আসাদ। পাসপোর্ট রি-ইস্যুর আবেদন ফরমে তিনি যখন বেনজীর আহমেদের ছবি দেখেন, তখন বেনজীরের কাছ থেকে আবু আসাদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের‘এনওসি’ চেয়ে নেন। এনওসি পাওয়ার পরও বেনজীর আহমেদকে তিনি অফিসিয়াল পাসপোর্ট ইস্যু করেননি। দিয়েছেন সাধারণ পাসপোর্ট।অফিসিয়াল পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়ার সঙ্গে এ টি এম আবু আসাদের দায়িত্বকালিন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, বায়োএন্ট্রি অপারেটর, অফিস সহকারি, উচ্চমান সহকারি ও সুপারিনটেনডেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অথচ এ মামলায়তাদের কাউকেই আসামি করা হয়নি।
সূত্রটি আরো জানায়,সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বেনজীর আহমেদ কখনো অফিসিয়াল পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি।পাসপোর্ট অধিদফতর থেকে প্রথম সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেন ২০০৮/২০০৯ সালের দিকে। এ ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ ছিলো শুধু ২০১১ থেকে ২০২০ সালের সময়-কাল পর্যন্ত। এর আগে এবং পরে যারা পাসপোর্ট রি-ইস্যু করেন তাদের মামলার আওতায় আনা হয়নি। সর্বশেষ যখন বেনজীরের পাসপোর্ট রি-ইস্যু করা হয় তখনও তিনি সশরীরে পাসপোর্ট অফিসে আসেননি।ফলে এই ‘ বেনজীর আহমেদ’সরকারি চাকরিজীবী পুলিশের ‘ বেনজীর আহমেদ’কিনা-এ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যায়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক।যখন বাসায় গিয়ে বেনজীরের ছবি তুলে আনেন তখন তিনি সচক্ষে বেনজীর আহমেদকে দেখেন। অথচ তিনি তখন বেনজীর আহমেদকে ‘পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ’হিসেবে সনাক্ত করেননি। অনুসন্ধানকালে দুদক টিম পাসপোর্টের তৎকালিন পরিচালক এটিএম আবু আসাদ, উপ-পরিচালক আবু নাঈম, সহকারি পরিচালক মোতালেবসহ অন্তত: ১৪ জনকে হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু এজাহারে আসামি করে বেছে বেছে, টার্গেট করে। যদিও সম্পৃক্ততা পেলে তদন্তকালেও সংশ্লিষ্টদের আসামি করার সুযোগ রয়েছে।

