সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান তয় খান কামাল সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে দুদকের একটি অনুসন্ধান কমিটি কামাল ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দসহ বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কামাল সিন্ডিকেটের অন্যরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস অতিরিক্ত সচিব হারুন অর রশিদ বিশ্বাস, যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন, সহকারী একান্ত সচিব মনির হোসেন এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু। কামাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠায় গত ১৫ আগস্ট দুদকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপ-পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। এ দিকে আসাদুজ্জামান খান কামালের অবৈধ অর্থ কোথায় কোথায় জমা আছে- এমন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য। কামালের ঘনিষ্ঠ সহচর ও ব্যবসায়িক পার্টনার আগস্টিন পিউরিফিকেশন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সুইস ব্যাংক খ্যাত দি মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের নাম। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছে, আসাদুজ্জামান খান কামালের অবৈধভাবে উপার্জিত হাজার কোটি টাকা দি মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডে জমা রয়েছে। সাথে সাকে সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য,সাবেক ডিবি কমিশনার হারুনুর রশিদ,ডিবি বনানী জোনের পরিদর্শক নাজমুল হোসেন,সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক আহসান কবিরসহ তেজগাঁও সার্কেল ও গাজীপুর জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার অবৈধ অর্থও এখানে আমানত আকারে জমা রয়েছে বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, আগস্টিন পিউরিফিকেশন আসাদুজ্জামান খান কামালের খুবই ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত। আসাদুজ্জামান খান কামালের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে তিনি দি মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি ও দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ(কালব) অবৈধভাবে দখলে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে আমেরিকা, দুবাই, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আইন আদালতকে নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। তার অন্যায়কে সমর্থন না করায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ও সমবায় অঙ্গনের অনেকের ওপর চালিয়েছেন অত্যাচারের স্টিম রোলার। আসাদুজ্জামান খান কামালের আশীর্বাদ থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলেননি।এমনকি কালবের রিসোর্টের দু’জন স্টাফকে হত্যা করে ধামাচাপা দিয়েছেন। কামালের ছত্রছায়ায় থাকায় কেউ মামলা করতে সাহস পায়নি। আগস্টিন পিউরিফিকেশন সমবায় অঙ্গনের মূর্তিমান আতঙ্ক। অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষ নিয়ে আগস্টিন পিউরিফিকেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এমতাবস্থায় দাম্ভিকতার সঙ্গে বহাল তবিয়তে থাকা আগস্টিন কে এখনো আইনের আওতায় না আনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সমবায়িগণ। সূত্র জানায়, মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্বপন ভট্টাচার্যের ম্যুরাল স্থাপন করেছিলেন আগস্টিন। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবার ম্যুরাল ভেঙে ফেলেছেন তিনি। আসাদুজ্জামান খান কামালের অবৈধ অর্থ উদ্ধারের জন্য আগস্টিন পিউরিফিকেশন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সুইস ব্যাংক হিসেবে খ্যাত দি মেট্রোপলিটন খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডে অভিযান পরিচালনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ প্রশাসনকে আহ্বান জানান খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও সচেতন সমবায়ীরা। টঙ্গী থানার পাগার গ্রামের এককালের দর্জি ও জমির দালাল অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া আগষ্টিন পিউরিফিকেশন কামালের আশির্বাদে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যে একাধিক বাড়ি, গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানাধিন পাগাড়ে বিলাশবহুল বাড়ী, টঙ্গীস্থ জীনুর মার্কেটে ২টি ১০ তালা বিল্ডিং, তেজগাঁও হুন্ডা গলিতে ২টি ফ্লাট, ১২২ মনিপুরিপাড়ায় ১টি ফ্লাট, উওরা ১৬ নং সেক্টরে ৫ কাঠা প্লট, এশিয়ান টাউনে ২টি প্লট, পাগাড়ে ১ বিঘার প্লট, পাগাড়ে ১৫ কাঠার উপর বাড়ী, শেরপুর বারমারিতে আড়াই বিঘা প্লট, তুমিলিয়ায় ২০ বিঘা প্লট, বাটারা ৪ নং সেক্টরে ২টি প্লট, ২য় স্ত্রী লতার নামে উওরার ৯ নং সেক্টরে ২টি প্লট, মাউসাইদে ২ বিঘা প্লট, উত্তরার দক্ষিণখানে ৫০ বিঘার প্লট এবং ভাদুনে ১টি প্লট। দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ ও দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ(কালব) এ লুটপাট করেই তিনি সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে, সমবায় সমিতি আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০০২,ও ২০১৩) এর ২৬ ধারায় বলা হয়েছে-বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক ব্যতিত কোন সমবায় সমিতি উহার সদস্য ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে আমানত গ্রহণ বা ঋণ প্রদান করতে পারবেনা। অথচ দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের (এমসিসিএইচএসএল) চেয়ারম্যান আগষ্টিন পিউরিফিকেশন আইন বহির্ভূতভাবে অমুসলিম (খ্রীষ্টান নয়) ও সদস্য নয় এমন ব্যক্তিদের সঞ্চয়ী সদস্য নাম দিয়ে তাদের নিকট থেকে আমানত গ্রহণ করছেন। এমনকি আইন ভঙ্গ করে সেন্ট্রাল এসোশিয়েশন অব খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভসসহ বিভিন্ন প্রাথমিক ও কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিরও আমানত রাখছেন যা সমবায় আইনের স্পষ্ট লংঘন। বিশেষ করে মুসলিমসহ অন্যান্য অখ্রীষ্টান সরকারি কর্মকর্তাদের অবৈধভাবে উপার্জিত কালো টাকা চড়া সুদে আমানত রাখছেন।এমসিসিএইচএসএল এর আমানতের বিপরীতে সুদের হার ব্যাংকের প্রচলিত সুদের হারের দ্বিগুণেরও বেশি। ১৫% পর্যন্ত সুদ দেয়া হয়। সমবায় অধিদপ্তরের অডিট রিপোর্টে নিবন্ধকের সার্কুলার ও ব্যাংকের প্রচলিত সুদের হারের সাথে সঙ্গতি রেখে আমানতের সুদের হার নির্ধারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুদের হার বেশি, আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের মত ভ্যাট ট্যাক্স দিতে হয় না, আবার খ্রীষ্টান প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখলে কেউ জানতে পারবে না-এসব কারণে পুলিশ কর্মকর্তা, সমবায় অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা তাদের উপার্জিত কালো টাকা এখানে আমানত রাখা নিরাপদ মনে করে। এক্ষেত্রে খ্রীষ্টান সদস্যদের আইডি ব্যবহার করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অখ্রীষ্টানদের আমানত গ্রহণ করা হয়।খ্রীষ্টানদের সদস্য হওয়া বা আমানত রাখার ক্ষেত্রে বিবাহিতদের ক্ষেত্রে গীর্জার বিবাহ সনদ এবং অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে গীর্জার বাপতিস্ম সনদ দাখিল করতে হয়। আর মুসলিমসহ অন্যান্য অখ্রীষ্টান আমানতকারিদের নামে খ্রীষ্টান হওয়ার ভুয়া এফিডেভিট তৈরি করে ডকুমেন্টস হিসেবে অফিসে সংরক্ষিত করা হয়। কেবল কালো টাকা আমানত রাখার জন্যে কাগজ পত্রে তারা খ্রীষ্টান সাজার অভিনব পন্থা অবলম্বন করে। নিরাপদে কালো টাকা রাখার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এমসিসিএইচএসএল বাংলাদেশের ‘সুইচ ব্যাংক’ আখ্যা পেয়েছে।
এছাড়া সমবায় সমিতি আইন -২০১৩ (সংশোধন) এর ১৮(১) ধারা ভঙ্গ করে এমসিসিএইচএসএল ১৪ টি শাখা কার্যালয় এবং সমবায় সমিতি বিধিমালা-২০০৪ এর ১২(২) বিধি লংঘন করে অনুমোদিত কর্ম এলাকার বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ সকল বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর পরিচালিত অডিট রিপোর্টে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।বেআইনী আমানত গ্রহণ, শাখা পরিচালনা ও কর্ম এলাকার বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধকরণ এবং সমবায় আইন,বিধিমালা ও এমসিসিএইচএসএলর উপ-আইন বহির্ভূত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

