পাঞ্জেরী ডেস্ক : হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করার পর ১১ বছর কেটে গেছে। রাজীব হায়দারকে মারা হয়েছে ২ বছর আছে। অভিজিতের মৃত্যুর পরে তিন দিন কেটে গেছে।
সরকার চুপ করে আছে। তারা কিছু বলে মৌলবাদীদের বিরাগভাজন হতে চায় না। বিএনপি কিছু বলবে না। তারা মৌলবাদীদের মিত্রদল। জামায়াত মৌলবাদীদের মূল হোতা। এরশাদ কোনো দলের মধ্যে পড়ে না—স্রেফ পুঁতি দুর্গন্ধময় জীবাণুমাত্র। আনু স্যার তেল গ্যাস থাকলে আছেন। তিনি খুব দ্বিধায় থাকেন—কোনটা আবার ভারতের পক্ষে চলে যায়। কোনটা আবার হিন্দুপক্ষের কথা হয়ে পড়ে। কোনটা আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তি জোগায়। এগুলো ঠিক তিনি পছন্দ করেন না। শুধু তেল গ্যাস—আর গ্যাস তেল হলে তিনি আছেন।
সিপিবি-বাসদের এখনো বাল্যদশা ঘোচেনি। এর আগেই তারা জবুথবু বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন। বাড়তি একটা লেপ তোষক দরকার। ড. কামাল হোসেনের সবার আগে দরকার জামাইকে বাঁচানো। বেচারা একটু বেয়াদ্দপ। কিন্তু তবু তো জামাই। খুশি রাখা দরকার। কাদের সিদ্দিকী মাসখানেক অফিসের সামনে কোলবালিশে হেলান দিয়ে আছেন। তিনি তার দিগন্ত টিভির চাকরিটা ফেরত চান। তিনি এ জগতে টাকা চান। পরজগতেও টাকা চান। টাকা ছাড়া আর কোনো কথা নেই। দিগন্ত টিভি মরজগৎ ও পরজগতের টাকা প্রাপ্তির একমাত্র পরীক্ষিত উপায়। ড. ইউনূস বেচারার নোবেল ছাড়া মনে আর কিছু নেই। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ পণ্ডিত মানুষ। পণ্ডিতদের বাণী দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ থাকতে পারে না।
আনিসুজ্জামান স্যারের অনেক কাজ। অনেক মিটিং সেমিনারের সভাপতিত্ব করা বাকি আছে। সবার উপরে আছে প্রথম আলোর দায়। ফলে তিনি এই বুড়ো বয়সে এতোটা সময় দিতে পারবেন না। সৈয়দ শামসুল হক সাহেব সবার উপরে কবি। শেষ বয়সে সময় নষ্ট না করে খেলা রাম খেলে যা’র আরেকটা সিক্যুয়াল লিখতে পারলে মন্দ হয় না। বাংলা একাডেমির চাকরি চলে গেলে প্রথম আলোর চাকরিটা নিশ্চিত করতে শামসুজ্জামান খানকে একটু বেশি সময় দিতে হচ্ছে। মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ ঠিক কবি না মাইকম্যান সেটা এখনো ঠিক করতে পারেননি।
নাসিরুদ্দিন বাচ্চুকে সন্ধ্যার পরে ফরহাদ মজহারের সঙ্গে একটু আড্ডায় বসতে হয়। লোকটা পুরনো বন্ধু। এখন হেফাজতের গুরু। তাকে হাতে রাখা দরকার। আবার পোলাপানের সঙ্গেও না থাকলে চলে না। একটা জগাখিঁচুড়ি অবস্থা। এখন আবার বয়স বাড়ছে।
এ ধরনের আর যারা আছেন বা থাকছেন অথবা যাদের থাকা দরকার, তাদের জন্য মাঝে মাঝে ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই’ বলে গলা সাধাটা নিয়তি। ফলে অভিজিতের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। রাজীবের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। হুমায়ুন আজাদের রক্ত ইটের মতো শক্ত। এই ইট দিয়ে একটা পোক্ত বাড়ি বানাবো। সেখানে কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমাবো। আর উঠে এক ফাঁকে চেঁচিয়ে বলবো—সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। মানি না মানবো না ইত্যাদি। অভিজিৎ পর্বটা মিলিয়ে গেলে আরেকজন এক্স ওয়াই জেডের লাশ পড়বে। তখন আবার মিটিং মিছিল মানববন্ধন করা যাবে। এই এক বিভৎস মজা। মজা ছাড়া এ জীবন বৃথা!
ফলে অভিজিৎ হত্যার বিচার হলো কি হলো না, সেটার ব্যাপারে কারো কোনো দায় নেই। ওটা অভিজিতের বুড়ো বাবার দায়। রাজীবের হত্যার বিচারের ব্যাপারে উকিল, কোর্ট কাচারির ঝামেলা রাজীবের বাবার ঝামেলা। হুমায়ুন আজাদের মামলার কি হলো কি হলো না সেটা অনন্য আজাদ ছেলেটার দেখার দায়িত্ব। বিচার যে থমকে আছে, বিচার যে হচ্ছে না সে ব্যর্থতা রাষ্ট্র, রাজনীতিক, সংস্কৃতি কর্মী, কবি, শিল্পী বা মানবাধিকার কর্মীদের নয়—ব্যর্থতা আজাদ স্যারের ছেলেমেয়েদের অথবা ওয়াইফের। সো অভিজিৎ, আপনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন। আপনি মৌলবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন। সেটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। পারিবারিক বিষয়। আপনি মরেছেন বলে আমরা মাঠ গরম করার একটা ইস্যু পেয়েছি। এটা আমাদের বিষয়। আর কি? এবার ধরা যাক দুএকটা ইঁদুর আবার।
তাহলে এই সব ধানাই পানাইয়ের কোনো মূল্য আছে? আছে। তবে সেটা খুবই সামান্য। বড়জোর তিন থেকে এক সপ্তাহ। একটু সা রে গা মা পা ধা নি সা।
কথা হলো, অভিজিৎকে হত্যা করা করা হয়েছে। এটা একটা খুনের মামলা। তিনি কেনো খুন হয়েছেন সেটা নিয়ে শুধু হৈচৈ করার মধ্যে দিয়ে কর্তব্য সমাধা করা মানে আরেকজন অভিজিৎ, রাজীব কিংবা হুমায়ুন আজাদের খুনের পথ করে দেওয়া। তাহলে কী করতে হবে?
করতে হবে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার সমাধা করার ব্যবস্থা গ্রহণ। সেজন্য মিটিং মিছিল বিবৃতি কলাম লেখার পাশাপাশি একটা শক্তিশালী আইনজীবী সেল গঠন করা দরকার যারা সর্বাত্মকভাবে লেগে থাকবেন কোর্টের পিছনে। মামলার পিছনে। কার্যকর আইনী লড়াই করে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় আদায় করে ছাড়বেন। সেই রায় কার্যকর করার জন্য কাজ করে যাবেন। এর জন্য প্রয়োজনীয় আইনজীবী, লোকবল, অর্থ, সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এই কাজটি আছে আমাদের দেশে? নেই। যারা মাঠ গরম করছেন তাদের কি কোনো পদক্ষেপ আছে এই বিষয়ে? নেই রে ভাই—নেই। ওটা পশ্চিমী সংস্কৃতি।
হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা গেলে অভিজিৎদের মৃত্যু সত্যিকারে ঠেকানো যাবে। হত্যার বিচার না হওয়ার হত্যাকাণ্ডে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। এটা এক ধরনের অসুস্থতা। এইভাবে অসুস্থ করে তোলাও মৌলবাদীদের একটি পরিকল্পনা। এটা মৌলবাদীরা জানে—আমরা জানি না। লেখক: কুলদা রায়

