সাহিত্য ডেস্ক : কাঠপরানের দ্রোহ(রিপনচন্দ্র মল্লিক। মূলত ছোটগল্পই লেখেন বেশি। পেশা: সাংবাদিকতা। বাবা রবীন্দ্রনাথ মল্লিক, মা রিনা মল্লিক। জন্ম তারিখ ১ জুন ১৯৮৬। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার খাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও মাদারীপুরের আলো-বাতাস আর জল-মাটি গায়ে মেখে বেড়ে উঠেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। দি বাংলাদেশ টুডে, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মানবকণ্ঠ, রেডিও আমার, ডেইলি ইন্ডাস্ট্রি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন। শখ ঘুরে বেড়ানো। কাজের ভেতরে সময় পেলেই দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ান। একুশে বইমেলা ২০১৫ তে প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘কাঠপরাণের দ্রোহ’ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এর মধ্যেই ২০০৭ সালে ছোটগল্প লিখে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের নামে প্রবর্তিত ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘কাঠপরানের দ্রোহ’ গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির জন্য পেয়েছেন দেশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৪।)
ফেসবুক ওপেন করতেই আমার চোখের সামনে একটি খবরের লিংক এসে হাজির হয়। শিরোনামটি দেখেই আমি কিছুটা চমকে উঠি।
‘আমায় একটি জন্ম সনদ দিন’।
শিরোনামটি এক নজর পড়েই, খবরটির ভেতরে যেতে আমার খুব আগ্রহ হয়। অথবা বলা যায়, রিপোর্টারের প্রতিবেদনের শিরোনাম লেখার বেশ কারিশমা আছে। পাঠককে কিভাবে সংবাদ পড়াতে বাধ্য করা যায়, তা রিপোর্টারের পুরোপুরি আয়ত্ত্বে রয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে শিরোনামটির লিংকের উপরে ক্লিক করতেই পুরো প্রতিবেদনটি আমার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে এসে উপস্থিত হয়। শিরোনামের নিচেই ক্রেডিট লাইনে রিপোর্টারের নাম ইমদাদ হক লেখা রয়েছে।
আমার ভেতরে আর যেন একটুও দেরি সহ্য হচ্ছিল না। কত দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদনটি আমি পড়তে পারব, এই তৃষ্ণা বুকের ভেতরটাকে তৃষ্ণার্ত করে ফেলেছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিবেদনটি পড়তে শুরু করি-
হেমন্তের শান্ত স্নিগ্ধ বিকেল। ঢাকার সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারিতে টানানো স্বাধীনতা যুদ্ধের খণ্ডচিত্র ধীরে ধীরে এক নারী দেখছেন।
মেয়েটির ব্রাউন কালারের গায়ের রং। নাকটি সামনের দিকে একটু মোটা। চেহারা দেখতে খুব আকর্ষণীয় না হলেও তার স্মার্ট ইমেজ সবকিছু আড়াল করে ফেলেছে।
পড়নে হালকা আকাশি রংয়ের একটি জিন্সের প্যান্ট, গায়ে হালকা গোলাপী কালারের একটি ফতুয়া। মাথার চুলগুলো ছোট হলেও পেছনের দিকে ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। ফলে মাথার পেছনের চুলগুলো মাঝারি আকারের একটি ফুটন্ত কালো গোলাপ ফুলের মতো দেখাচ্ছে। পায়ে ছাই রঙের লোফার।
তিনি যে একজন বাংলাদেশি আধুনিক মেয়ে, সেটা ভাবা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বয়স যে কত হবে সেই সঠিক সংখ্যাটি আন্দাজ করা খুবই মুশকিল।
মেয়েটি দেয়ালে টানানো স্বাধীনতা যুদ্ধের চিত্র, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে নির্যাতিত নারী, ক্ষুধার্ত শিশুর আঁকড়ে ধরা মায়ের শূন্য বুক, মা-বোনদের হাত পা বেঁধে পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার দৃশ্য, গণকবরের গলিত লাশের ছবি চুপচাপ নিবিড় মনোযোগে দেখছিলেন।
হাতে থাকা মোবাইল ফোন সেটটি দিয়ে দেয়ালে টানানো মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নির্মম বর্বরতা ও অমানবিকতার সাক্ষী হয়ে থাকা এইসব ছবিগুলোর ছবি তুলছিলেন।
খেয়াল করে দেখলাম, তিনি ছবিগুলোর মধ্যে মগ্ন হয়ে এমন করে ঢুকে পড়েছেন যেন ছবিতে থাকা মানুষগুলোর সাথে তিনি একা একা কথা বলছেন। দেখতে দেখতে বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্ট যেন আর চেপে রাখতে পারছিলেন না। এক সময় দেখলাম, তিনি হাউ মাউ করে কাঁদছেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদঘরে আগেও কয়েকবার অফিসের অ্যাসাইনমেন্টে এসেছি। কিন্তু কখনোই কাউকে শুধু ছবি দেখে এভাবে শিশুর মতো করে কাঁদতে দেখিনি।
মেয়েটির কান্না শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কাঁদছেন কেন, কী হয়েছে?’
প্রথমবার সে আমার কথা সম্ভবত বুঝতে পারেনি। এবার আমি একই কথা ইংরেজিতে বলি।
এবার তিনি আমার কথা বুঝতে পেরে বললেন,‘এই ছবিগুলোর বাস্তবতা মনে করে আমার বুকটা যেন ভেঙে আসছে।’ আমি তার কথায় কিছুটা অবাকই হই।
স্বাধীনতা উত্তর এই পঞ্চম দশকে বাংলাদেশে এখনো কী কেউ মুক্তিযুদ্ধের ছবি দেখে কাঁদতে পারে? কেউ যদি এই গল্পটি আমাকে বলত, তাহলে হয়তো আমি সহজে বিশ্বাস করতে পারতাম না। কিন্তু এই দৃশ্যটি যে আমার নিজের চোখের সামনেই ঘটছে, তাই বিশ্বাস আমাকে করতেই হচ্ছে।
আমার ভেতরে মেয়েটিকে আরো ভালো করে চেনা-জানার কৌতুহল জেগে উঠল। তার কথা বলার ইংরেজি উচ্চারণ আমাদের দেশের মতো নয়, তার উচ্চারণ শুনে জিঞ্জেস করি-
‘আপনার পরিচয়টা কী জানতে পারি?’
মেয়েটি ব্যাগ থেকে একটি টিস্যু পেপার বের করে চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, ‘আমি মনোয়ারা ক্লার্ক। কানাডায় থাকি। গতকাল অনেক বছর পরে দেশে এসেছি।’
‘ও..তাই।’ শব্দটি উচ্চারণ করতে আমার কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে বেশ নরম ও দুর্বল হয়ে এলো।
নামটি শুনে ভাবতে থাকি, ‘মেয়েটি মনে হয়, কানাডায় গিয়ে খ্রিস্টান হয়েছে। আজকাল বিদেশে সুবিধা পাওয়ার আশায় অনেক বাংলাদেশিই তো নাম, ধর্ম পরিচয় বদল করে ফেলছেন। এগুলো এখন আর এদেশে আলোচনা করার মতো কোনো বিষয়ই নয়।
আবার ভাবতে থাকি- মেয়েটি নাম, ধর্ম বদল করলে কী হবে। নিজের গায়ের রং, উচ্চতা, পোশাক-আশাক, চেহারায় বাংলাদেশি রূপ তো আর বদল করতে পারেনি। তাকে দেখলে তো মনে হয় তিনি এখনো সাদা চামড়াদের সাথে মিশে যেতে পারেননি। এখনো তিনি বাংলাদেশিই রয়ে গেছেন। তাই মনে হয় একটু দেরিতে হলেও দেশের টানে ফিরে এসেছেন।
এবার আমি মেয়েটিকে নিজের পরিচয়টা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বললাম-‘আমি ইমদাদ হক, একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার।’
আমার পরিচয়টা পেয়ে মনোয়ারার মুখে ভোরের কোমল কচি আলোর মতো নরম এক ঝলক সোনা ঝরা রোদ ফুটে উঠল। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন আমাকে পেয়ে একটু নির্ভরতার ছায়া খুঁজে পেলেন। তার মুখের উজ্জ্বলতা দেখে আমিও একটু হেসে ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন জানি আমার মুখে হাসি ফুটে উঠতে পারছিল না।
সে আমাকে বললো, ‘ভাই আপনিই তো আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন।’
আমি একটু ইতস্তত বোধ করে বললাম, ‘তাই নাকি! কিন্তু কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’
একটিও বাংলা শব্দ না জানা মনোয়ারা ক্লার্ক বললেন, ‘আপনার পত্রিকায় আমার জীবনের গল্প লিখে দিতে পারেন?’
আমি একটু মুচকি করে হেসে ফেলি। অবশ্য হেসে ফেলার একটি সঙ্গত কারণ রয়েছে। আমার এই ছোট্ট সাংবাদিকতা জীবনে মনোয়ারা ক্লার্কের এই কথাগুলোর সাথে খুব পরিচিত। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মানুষের কাছ থেকে এই লাইনটি আমাকে শুনতে হয়।
তারপরেও আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,‘আচ্ছা বলুনতো আপনার জীবনে এমন কী গল্প আছে যা মানুষকে জানাতে পারি অথবা আপনার এমন কী গল্প আছে যেটা মানুষ জানতে আগ্রহী হতে পারে?’
‘কানাডা থেকে আমার হারিয়ে ফেলা মাকে খুঁজে পেতে এসেছি। কেন এসেছি, সে কথাটাই একটু লিখে দেন।’
এবার আমার কৌতুহলটা আরো একটু বেড়ে গেল। আমি বললাম,‘পত্রিকায় লিখলে অনেক সময় সাড়া পাওয়া যায় আবার কখনো কখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। তবে আপনি আপনার মায়ের হারিয়ে যাওয়া গল্প শোনাতে পারেন। আপনার জীবনের গল্প লেখার চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘এই জাদঘুরের দেয়ালে টানিয়ে রাখা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে নির্যাতিত নারী, ক্ষুধার্ত শিশুর আঁকড়ে ধরা মায়ের শূন্য বুক, গণকবরের গলিত লাশের ছবিগুলোর ভেতরেই আমার মাকে খুঁজছি।’
মনোয়ারা ক্লার্কের মুখে এই কথা শোনার পরে আমার মাথার খোল নলচে নড়াচড়া দিয়ে ওঠে। আরে বলে কী এই ভদ্র মহিলা! কথা বলতে বলতে এরই মধ্যে আমরা জাদুঘরের গ্যালারির এক পাশে একটু নিরিবিলি জায়গায় বসে পড়লাম। বসতে বসতে আমি মনোয়ারা ক্লার্ককে বললাম, ‘তারপর বলুন…আপনার জীবনের গল্প শুনতে চাই।’
এই পর্যন্ত প্রতিবেদনটি পড়ে পাঠক হিসেবে কিছুটা থমকে যাই। অথবা থমকে যাই না বলে, আমার বলা উচিত আমার মোবাইলে সুমনা কল দিয়েছে। আমি কল রিসিভ করতেই সুমনা বলে উঠল, ‘অর্নব খবর শুনেছ। তুমি শুধু শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে পড়ে থাকতে, এখন দেখো সরকার তো রাজাকার কামরুজ্জামানের ফাঁসি নিয়ে খেলা শুরু করেছে?’
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে কামরুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর আরো পিছিয়ে যাচ্ছে।’
আমি বলি, ‘তাই নাকি!’
‘তাই তো টেলিভিশনে দেখাচ্ছে।’
‘ঠিক আছে। সরকার যদি এরকম খেলতে থাকে, থাকুক। যখন জনগণ খেলা শুরু করবে, তখন গদি ছেড়ে পালাতে হবে।’
‘ঠিক আছে, সুমনা। আমি এখন একটি প্রতিবেদন পড়ছি। তোমার ফেসবুকে লিংকটি পাঠিয়ে দেব, পড়ে দেখো।’
‘কিসের প্রতিবেদন?’
‘একজন নারীর আত্মপরিচয়ের গল্প।’
‘তাই।’
‘মনে হচ্ছে, এই প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে, নতুন মুখ নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।’
‘ঠিক আছে আমাকে পাঠিয়ে দিয়ো। পড়ে দেখবো।’
‘আচ্ছা।’
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ইন্টারনেটের ডিজিটাল ছাপার অক্ষরে ইমদাদ হকের লেখা প্রতিবেদনটির উপর থেকে পাঠক হিসেবে আমার চোখ আর কোথাও সরছিল না।
নাকের উপরে কান দুটো ধরে বসা চশমাটিকে খুলে টিস্যু পেপার দিয়ে পরিষ্কার করে আবারো নাকের উপরে বসিয়ে, মোবাইল স্ক্রিনে প্রতিবেদনটি পড়তে শুরু করি।
প্রতিবেদনে মনোয়ারা ক্লার্ক বলতে শুরু করে, ঢাকা থেকে ৪৩ বছর আগে কানাডাতে চলে যাই। এরপর আর কখনো ফিরে আসা হয়নি। কানাডার মি. ক্লার্ক ও মিসেস হেনরি ক্লার্ক দম্পতিদের দত্তক কন্যা হিসেবে জীবনের বারোটি বছর এক সাথে থাকি।
এক সময় ক্লার্ক দম্পতি আলাদা হয়ে গেলেও আমি মিসেস হেনরি ক্লার্কের সাথে থেকে যাই।
আমার বয়স যখন তের অথবা চৌদ্দ বছর, তখন মিসেস হেনরি ক্লার্কের কাছ থেকে আলাদা হয়ে মার্গারেট নিকেল নামে এক ভদ্র মহিলার কাছে আশ্রয় পাই।
মার্গারেট নিকেলকেই মা হিসেবে জানি। তিনি আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভালোবাসা কাকে বলে শিখিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জীবনের কণ্টকময় পথগুলো কীভাবে পাড়ি দিতে হয় তার কাছ থেকেই একটু একটু করে শিখেছি।
‘তারপর….’
তারপর এক সময় আমি কানাডারই একটি ইউনিভার্সিটি থেকে নার্সিংয়ের ওপরে পড়াশোনা শেষ করে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারের একটি বেসরকারি ওল্ডহোমে নার্সিংয়ের চাকরিতে যোগ দেই।
মনোয়ারার কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে বলি,‘হুম।’
তিনি বলতে থাকলেন, চাকরি জীবনের এক সময়ে এক যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ভালো বন্ধুত্ব। যাকে আমি মি. ফিনল্যান্ড বলে ডাকি। এবং এক সময় আমরা বুঝতে পারি আমরা দু’জনে প্রেমে পড়েছি। শেষ পর্যন্ত আমরা সম্পর্কের মায়াজালে পড়ে বিয়ে করি।
বিয়ের পরে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে আমাদের দিন, আমাদের রাত ছিল খুব আনন্দময়। প্রতিটি মুহূর্ত স্বপ্নের মতো ছিল।
বছর খানেক পরেই আমাদের সংসার আলোকিত করে জন্ম নেয় আমার মেয়ে জুলিয়া। মেয়ের বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন থেকেই আমার স্বামীর সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়।
‘টানাপড়েনটা শুরু হয় কেন?’
‘মেয়ে জুলিয়াকে নিয়েই আমাদের সংসার জীবনের টানাপড়েনের শুরু হয়েছিল।’
‘তাই। কিন্তু কেন?’
‘জন্মের সময়ে জুলিয়া একজন অটিস্ট্রিক শিশু হিসেবে পৃথিবীর আলো বাতাসে আসে। আমার স্বামী মি. ফিনল্যান্ড জুলিয়ার এভাবে জন্মগ্রহণ মেনে নিতে পারছিল না। সে সব সময় অটিস্টিক শিশু হিসেবে জুলিয়ার জন্মগ্রহণের জন্য আমাকেই দায়ী করে।’
আমি মনোয়ারা মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কথা শুনছিলাম। এই মুহূর্তে শ্রোতা হওয়া ছাড়া আমার কোনো ভূমিকাই নেই।
সে আমাকে বলছিল,‘ইমদাদ ভাই, আমার শরীরে কয়েকটি জন্মদাগ এখনো স্পষ্ট। জন্মের পর থেকেই এই দাগগুলোকে আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।’
আমি কিছুটা অবাক হয়ে বলি, ‘তাই নাকি!’
‘হুম, আমি যখন বড় হচ্ছিলাম। একটু একটু করে বুঝতে শিখছি। তখন আমার পালক মা মিসেস ক্লার্কের কাছে শুনি আমার ঘাড়ে, পিঠে, বাহুর দাগগুলো বেয়নেটের খোঁচানি।’
কথা শুনে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। কী আশ্চর্য! এই দাগগুলোর জন্যই কী তার স্বামী অটিস্ট্রিক শিশু প্রসবের জন্য মনোয়ারাকে দায়ী করছে? আমি আর এমন অদ্ভুত কথা শুনতে পারছিলাম না। তবুও আমি এখন নাছোরবান্দা। আমাকে যে সব গল্পটুকু শুনতেই হবে।
মনোয়ারা কথাগুলো যখন বলছিল, কখনো তার গলা খাদে নেমে আসে। কখনো স্বাভাবিক। সে বলছিল, ‘ঢাকার মাদার তেরিজা হোমে আমি জন্মেছিলাম। ১৯৭২ সালের ১৮ জুলাই এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে করে ইন্টার চাইল্ড অ্যাডাপপ্টেশন প্রজেক্টের আওতায় পনের শিশুকে কানাডায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ওই পনের জন শিশুর একজন এই আমি হতভাগা মনোয়ারা বেগম ক্লার্ক।’
‘আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না। মনোয়ারার কথাই শুনছি। সে বলছিল- ‘আমার ৪৩ বছরের এই জীবনের পুরোটাই কেবল উত্থান পতন আর ভাঙ্গা গড়ার মধ্যেই কেটেছে।’ সে যখন কথাগুলো বলছিল, আমি দেখছিলাম তার চোখ কখনো কখনো কুয়াশার মতো ভিজে উঠছে।
কথা বলার এক পর্যায়ে গ্যালারির দেয়ালে থেকে মোবাইলে তোলা মুক্তিযুদ্ধের বিধ্বস্ত নারীদের ধর্ষণের ছবিগুলো দেখিয়ে বলে, ‘এই ছবিগুলো দেখলে খুব কষ্ট হয়। আমাকে জন্ম দিতে মাকে কী কষ্টই না করতে হয়েছে।’
বড় হয়ে জেনেছি আমার মা, পাকিস্তানি সেনাদের একটি ক্যাম্পের কাছেই মৃত পড়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কানাডিয়ান চিকিৎসক হালকে ফেরি বিশেষ ব্যবস্থায় আমাকে এই পৃথিবীর আলো বাতাস দেখিয়েছেন।
আমি শরীর জুড়ে যে জন্মদাগ বয়ে বেড়াচ্ছি, সে দাগ আমার মায়ের শরীর জুড়ে পাকিস্তানি সেনাদের বেয়নেটের খোঁচনির চিহ্ন। খুব কষ্ট হয় মায়ের কথা মনে এলেই আর কুৎসিত বাবার কথা মনে হলেই ঘৃনায় শরীর গুলিয়ে ওঠে।’
জুলিয়ার বাবা শুধু বলে, ‘আমার কোনো পরিবার নেই। আমার কোনো জন্ম সনদ নেই। আমি ওয়ার বেবি। তাই আমার মেয়ে জুলিয়া অটিস্ট্রিক শিশু হয়েছে। কথাগুলো বলতে বলতে মনোয়ারা ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।’
আমার ব্যাগের পকেটে থাকা একটি টিস্যু পেপার বের করে মনোয়ার দিকে বাড়িয়ে দেই। কোনো বাংলা না জানা এই মেয়েটি টিস্যু পেপারটিকে হাতে নিয়ে তার টলটল চোখ মুছতে মুছতে আমাকে বলতে লাগলো, ‘মাই হোল লাইফ ইজ ফুল নেগলিজেন্সিস, আপস অ্যান্ড ডাউন, ব্রোকেন রিলেশনশিপ, অল দিজ মেইড মি সো স্যাড। সো স্যাড। আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই বার্থ সার্টিফিকেট। আই ওয়ান্ট টু লিভ মাই লাইফ অ্যাজ বাংলাদেশি।’
আবারো মোবাইলে তোলা নির্যাতিত নারীদের ছবিগুলো আমাকে দেখিয়ে বলছিল, ‘দ্যাখো, আমার মা-ও তো হয়তো এরকম ছিল। আমার মা কে ছিল জানি না, কিন্তু এই বাংলাদেশ তো আমার মা। আমি তো এই বাংলা মায়েরই সন্তান। আমাকে কী তোমরা একটি জন্ম সনদ দিতে পারো? আমি আমার আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে চাই।’ এখন আর আমি তার কান্না থামানোর চেষ্টা করি না।
এই বাংলার বুকে কেঁদে কেঁদে সে ক্লান্ত হোক। মনের অব্যক্ত কষ্টগুলো কান্না হয়ে ঝড়ে পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক।
প্রতিবেদনটি পড়া শেষ হতেই দেখি আমার চোখ ভিজে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে টপটপ করে বৃষ্টির মতো ফোটা পড়ছে।
এ বৃষ্টি আর কারো নয়। এ বৃষ্টি আমার, আমাদের আত্মপরিচয়ের অহংকার।
গল্পসূত্র: কাঠপরানের দ্রোহ

