বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লেই ডুবে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। কোথাও হাঁটু সমান পানি, কোথাও কোমর সমান। এতে বাড়ে জনদুর্ভোগ-ভোগান্তি। সর্বশেষ শুক্রবারও (১২ জুলাই) জলাবদ্ধতার নিদারুণ অভিজ্ঞতা পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।
শুক্রবার মৌসুমের সর্বোচ্চ ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যায় ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, মতিঝিল, আরামবাগ, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, কাজীপাড়া, রোকেয়া সরণি, দক্ষিণখান, কল্যাণপুর, বিজয় সরণি, মালিবাগ, মৌচাকসহ ঢাকার অন্তত তিরিশটি এলাকা। ডুবেছে বিভিন্ন শপিং মার্কেটের দোকানপাট, জলমগ্ন ছিল বাসাবাড়িও।
এই পরিস্থিতির কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সমস্যা প্রায় একই। স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনে বর্জ্য জমে থাকা, খাল ভরাট ও কংক্রিট স্থাপনার আধিক্য, জনগনের অসচেতনতা ইত্যাদি জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। এ ছাড়া রাজধানীতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উন্নয়ন কাজের সমন্বয় না থাকাও অন্যতম কারণ। মূলত এই পাঁচ কারণেই ডুবছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। সেই সঙ্গে রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে অবহেলাও।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. আদিল মুহম্মদ খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ জলাশয় ভরাট করে করা উন্নয়ন। এই উন্নয়ন সমষ্টিগত এবং সরকারি পর্যায়ে। আগামী বছর যে, এটি থাকবে না তা বলার সুযোগ নেই। এ সব আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আজাব আমাদের ভোগ করে যেতেই হবে।’
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন অভিযান চালিয়ে খাল উদ্ধার করলেও তা নানা কারণে টেকসই হচ্ছে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের বিষয়টি পরিষ্কার না। অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করা হলেও দোষীরা কারাদণ্ড বা অন্য শাস্তি পাবে কিনা তা আমরা জানি না। একদিকে উচ্ছেদ হচ্ছে, পাশেই অন্য ভবন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমাদের বেসুমার উন্নয়নেরও কোনো মাপকাঠি নেই।’
এই নগর বিশেষজ্ঞ এর ভাষ্যমতে- জলাধারের পাশাপাশি সবুজ ধ্বংস করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি শোষণ করার জন্য পর্যাপ্ত মাটিও নেই। বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারিভাবেও শুধু ভবনই নির্মাণ করা হচ্ছে। হাতিরপুলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ হয়েছে, আজিমপুর কলোনিতেও একই অবস্থা। এভাবে গাছপালা ও মাটি ধ্বংস করে নির্বিচারে কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানি মাটির গভীরে শোষিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এছাড়া ভবন নির্মাণের সময় ৪০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা রেখে বাড়ি বানানর নিয়মও কেউ মানছেন না।
তিনি বলেন, ‘এখনই আমাদের পরিপূর্ণ বোধোদহয় না হলে ঢাকা শহরকে রক্ষা করা যাবে না। সিটি করপোরেশন, রাজউক সবাইকে সচেতন হতে হবে ও কাজ করতে হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, জলাবদ্ধতার পুরো দায় সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। এই জলাবদ্ধতার পেছনে সাধারণ মানুষ ও দখলদারদেরও দায় রয়েছে। এত জনবহুল একটি শহরে পুরনো ড্রেন নানাভাবে অকেজো বা ভরাট হয়ে গেলেও নতুন ড্রেন নির্মাণ হচ্ছে না।
দক্ষিণ করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছিম আহমেদ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন বৃষ্টি এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও হচ্ছে। তারাও হিমশিম খাচ্ছে পানি সরাতে। রাজধানী ঢাকাতে শুক্রবার (১৩ জুলাই) যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা রেকর্ড পরিমাণ। এর ফলে আমরা পানি সরাতে হিমশিম খেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে যেসব ড্রেন পেয়েছি সেগুলো বর্জ্যে ঠাসা। বৃষ্টি হলেই শুধু নয়, এর বাইরেও আমরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও চালাই। আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ড্রেনের মধ্যে নির্মাণ সামগ্রির বর্জ্য থেকে শুরু করে এমন কোনো বর্জ্য নেই যে ফেলা হয় না। ড্রেনের মুখ খুললে প্লাস্টিকের প্যাকেট, ককশিট থেকে শুরু করে নানা কঠিন বর্জ্য থাকে। এ সব কঠিন বর্জ্যের কারণে দ্রুত পানি সরতে পারে না।’

