ঢাকাTuesday , 30 April 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের পরিদর্শক মেহেদী হাসানের বেপরোয়া দুর্নীতি থামাবে কে?

Link Copied!

বাংলাদেশ মেরিন একাডেমী চট্টগ্রাম এর ৪৭তম ব্যাচের ডেক ক্যাডেট মেহেদী হাসান ২০১৯ সালে ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে ইন্সট্রাক্টর (৯ম গ্রেড) হিসেবে যোগদান করেন। কর্মস্থলে যোগদান করার পর থেকেই তিনি নানাবিধ ব্যবসায়িক কাজে জড়িয়ে পড়েন। এ ব্যাপারে তৎকালীন অধ্যক্ষ ফয়সাল আজিম বারংবার সতর্ক করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার ব্যবসায়িক কাজের পরিচিতি ক্ষেত্র তৈরীর জন্যই তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, এখনও তিনি যে কোন প্রকার ব্যবসায়িক কাজে জড়িত আছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরপরই তিনি নদী থেকে বালু উত্তোলন এবং সে বালু বিপণনের সাথে জড়িত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু সংগ্রহ করে সে বালু দেশের বাহিরে পাচার করতেন বলেও জানা গেছে। এছাড়াও চাকরির শুরু থেকেই তিনি আরো বিভিন্ন রকমের ব্যবসার সঙ্গে নামে এবং বেনামে সংযুক্ত ছিলেন। তবে বাহিরে ব্যবসা করেও তিনি ক্ষান্ত হননি বরং কিছুদিন পরেই সরাসরি ব্যবসার জন্য ব্যবহার করতে থাকেন ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট এর বিভিন্ন সরকারি সম্পদ এবং ছাত্র ও কর্মচারীদের। তারই অংশ হিসেবে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের পাখি, মুরগি পালন, মাছ চাষ, সবজি ইত্যাদ শুরু করেন। সেগুলোর দেখাশোনার কাজে তিনি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের কাজে লাগান।
তার কিছুদিন পরেই তার চরিত্রের কলঙ্কিত অধ্যায় সবার সামনে ফুটে ওঠে। তিনি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহায়ক পদে কর্মরত হোসনে আরা বেগমকে যৌন হেনস্থা করেন। এ বিষয়ে তৎকালীন অধ্যক্ষের নিকট যখন অভিযোগ করা হয়েছে তিনি তা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু করেন। তবে তৎকালীন অধ্যক্ষ পদত্যাগ করলে বর্তমান অধ্যক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেন।
এরপরেই তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন ভর্তি বাণিজ্যে। ন্যাশনাল মেরিটাইম ইন্সটিটিউট চট্টগ্রাম এর ভর্তি পরীক্ষায় তিনি বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদেরকে জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিতেন। এ বিষয়ে জানা গেছে যে, ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট এর ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিবারই সে দালালচক্রের মাধ্যমে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে একটি ভর্তিচ্ছু ছাত্র গ্রুপ তৈরি করেন । সর্বশেষ ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউ চট্টগ্রাম কর্তৃক আয়োজিত ভর্তি পরীক্ষায় পরীক্ষার হল রুমে তার গ্রুপের পরীক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেন । পরে পরীক্ষার প্রশ্ন পাওয়ার সাথে ছবি তুলে বাহিরের টিমের কাছে পাঠিয়ে দেন । ফলে প্রশ্ন: উত্তর: সমাধান হয়ে প্রার্থীদের মোবাইলে চলে আসে এবং চুক্তি অনুযায়ী তারা সহজে ভর্তির সুযোগ পায়। এ বিষয়ে পুলিশী তদন্ত পর্যন্ত গড়ালে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভর্তি পরীক্ষা নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে নেয়।
এনএমআই চট্টগ্রাম শাখায় ছাত্রদের খাবার ডাইনিং পরিচালনা পূবের্র প্রিন্সিপালের নেতৃত্বে কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হত। ছাত্রদের প্রতিনিধিরা খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করত। কিন্তু গত কয়েক ব্যাচ ধরে অর্থাৎ বর্তমান প্রিন্সিপাল দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ডাইনিং একটি ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। এই কাজের দায়িত্ব প্রথমে ইন্টারন্যাশনাল মেরিন কর্পোরেশনকে দেয়া হয়েছে যার মালিক মেহেদি হাসান নিজেই। মাতা জাহানারা খাতুন এর নামে লাইসেন্স নিয়েছেন। তবে পত্রিকায় লেখালেখি হবার পর তিনি বর্তমানে বেনামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় খাবারের মানও আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী হয়েছে। কিন্তু তার প্রভাবের কারণে এই সমস্যার প্রতিকার করা যাচ্ছেনা। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী এবং নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারিদের সরাসরি এই কাজে ব্যবহার করেন এবং সরকারি গ্যাস ও কারেন্ট বিনা বাঁধায় ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত এই নিয়মবহির্ভূত ব্যাবসায়িক কাজ করে যাচ্ছেন।
এছাড়াও ছাত্রদের ট্রেইনিং ব্লকে ওয়ার্কশপের ইমারজেন্সি ফায়ার এক্সিট বন্ধ করে সেখানে তিনি একটি দোকান খুলেছেন। ডাইনিং থেকে পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় ছাত্ররা তার দোকান থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। একজন সরকারি কর্মচারী কিভাবে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে নিজ ক্যাম্পাসে দোকান খুলতে পারে তা তদন্ত করার দাবি উঠে। উপরন্তু তার দোকান থেকে ছাত্ররা বিনা বাধায় সিগারেট কিনছে এবং সমগ্র ক্যাম্পাস স্মোকিং জোনে পরিণত হয়েছে। এটি ছাত্রদের কোড অফ কন্ডাক্ট এর পরিপন্থী। ফলে রেজিমেন্টাল ট্রেনিং ব্যাহত হচ্ছে।
ইন্সটিটিউটের ট্রেনিং লেক (পুকুর) তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করছেন। প্রিন্সিপালের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি সেখানে বাণিজ্যিকভাবে মাছের চাষ করছেন।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তার ব্যবসায়িক পণ্যের উৎপাদন কাজে তিনি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট এর গ্যাস, বিদ্যুৎ এমনকি ছাত্রদের ও ব্যবহার করেছেন। বিশেষত তার ব্যবসায়িক পন্য ক্যাপ্টেন টয়লেট ক্লিনার এর সম্পুর্ন উৎপাদন তিনি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে এর বিভিন্ন রিসোর্স এবং ছাত্রদেরকে ব্যবহার করে করেছেন।
ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউ চট্টগ্রাম এর বর্তমান প্রিন্সিপালের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি এসব কাজ প্রকাশ্যে করে বেড়াচ্ছেন। তিনি কর্মস্থলে তেমন উপস্থিত থাকেন না। আর থাকলেও সারাক্ষণ উনার কাছে তার ব্যবসায়িক লোকজন আসতে থাকে । এতে করে তার মূল দায়িত্ব ব্যাহত হচ্ছে যা উক্ত কর্মকান্ড সরকারি কর্মচারী আইনে দন্ডনীয় অপরাধ। তিনি উদ্যেক্তা ডট কম, ইন্টারন্যাশনাল মেরিন কর্পোরেশন, জেব্রা শিপিং, ক্যাপ্টেন গ্রুপসহ আরো অনেক ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ।
তিনি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের টেন্ডার কমিটির সদস্য। সে সুবাদে তার মায়ের নামের নিজ কোম্পানি ইন্টা: মেরিন কর্পোরেশনকে বিভিন্ন কাজ বেআইনি ভাবে পাইয়ে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এই ব্যবসায়িক কোম্পানিটি তার নিজেরই কোম্পানি এবং তিনি সরকারি কাজে ফাঁকি দিয়ে সেটা পরিচালনা করেন।
ইংরেজি বিষয়ের অতিথি প্রশিক্ষক তাকওয়া সিদ্দিক এর সাথে জনসম্মুখে অনেক মাখামাখি করেন এবং তার অফিস রুম ব্যবহার করে থাকেন । মাঝেমাঝে ওই কক্ষ বন্ধ থাকে এবং অনৈতিক সম্পর্কের আভাস পাওয়া যায় ।
ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের ব্যানার ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের মাধ্যমে কাজ আদায় করে থাকেন। সম্প্রতি রংপুর মেরিন একাডেমি এবং বরিশাল মেরিন একাডেমিতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করেছেন।
এ বছরের শুরুতে তিনি অতিথি প্রশিক্ষক ফারজানাকে সিমুলেটর ভবনে যৌন হেনস্থা করেন। পরবর্তীতে এই বিষয় এ তদন্ত না করে তিনি প্রিন্সিপালকে নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দেন এবং ফারজানাকে ভবিষ্যতে এখানে স্থায়ী চাকুরী দেওয়া হবে বলেন, তাই চুপ থাকতে বলেন। তারই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইন্সটিটিউট প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তাকে ক্যাটারিং ইন্সট্রাক্টর পদে চাকরি দেওয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। অথচ ফারজানার উক্ত পদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই। তাই মেহেদির সহায়তায় নকল অভিজ্ঞতা সনদ ও ট্রেনিং সনদ তৈরি করছেন।
ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট মাদারীপুর শাখায় তিনি মনিটরিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে পদমর্যাদার অপব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে তিনি কয়েক কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে সেই শাখার টেন্ডার অফিসার, মনিটরিং অফিসার, সাব কন্ট্রাক্টর এবং রিসিভিং কমিটির প্রধান হিসেবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে চরম দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেন। পরবর্তীতে অতি নিম্নমানের সরবরাহ এবং ঠিকাদারি কাজের কথা স্থানীয় সাংবাদিকরা জানতে পারলে তাদের চাপের মুখে পড়ে মন্ত্রণালয় রিসিভিং কমিটি পরিবর্তন করে দেয়। তবে অভিযোগ আছে যে এতকিছুর পরেও এখন পর্যন্ত সাব কন্ট্রাক্টে যে সকল কাজ নিয়েছেন তা সরবরাহ সম্পন্ন করেননি। তার এই অপকর্মের কারণে সেই শাখাটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
গত বছর এইসব অপকর্মের সত্যতা বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে বেরিয়ে আসলে মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অদৃশ্য শক্তির বলে সেই তদন্ত রিপোর্ট কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এ থেকে বুঝা যায় মেহেদী হাসানের সাথে দুর্নীতিগ্রস্থ লোকজনের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে মাত্র ৫ বছরে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার পরেও কেন তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তা সত্যিই বিস্ময়কর বরং কোন অ্যাকশন না হওয়ায় তিনি এখন দুর্নীতিতে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে, যে স্পেশাল ব্যাচে ভর্তি করিয়ে দেয়ার নাম করে প্রায় তিনশত ছাত্রদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণের অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেছেন। একটি সক্রিয় দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষনার্থীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ৮ লক্ষ টাকার বিনিময় স্পেশাল ব্যাচে ভর্তি করিয়ে দিবেন বলে আশ্বাস প্রদান করে নামে বেনামে এই টাকা তিনি সংগ্রহ করেছেন। তার দালাল চক্রের মূল সদস্য নাবিক ও শ্রমিক কল্যাণ পরিদপ্তরে কর্মরত হেলাল এর ভাই বেলাল। জানা গেছে, যে বেলাল একটি শিপিং এবং ম্যানিং এজেন্সির মালিক যার সুপ্ত অংশীদার হলেন মেহেদী হাসান। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জানা যায়, তিনি কিস্তিতে ৮ লক্ষ টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে নামে বেনামে মেহেদীকে পাঠিয়েছেন। যার মধ্যে একটি অ্যাকাউন্ট মোঃ ইউসুফের নামে। ভুক্তভোগী আরো জানান, এই মোঃ ইউসুফের ইসলামী ব্যাংকের একটি ব্যাংক একাউন্টে তিনি প্রথম কিস্তির টাকা শোধ করেছেন। অ্যাকাউন্ট নাম্বারটি হল ২০৫০৭৭৭০২০৪৫১২৪৯৫। পরবর্তীতে জানা যায়, এই ব্যক্তি মোঃ ইউসুফ প্রকৃতপক্ষে একজন জমির দালাল। তার এবং মোঃ বেলালের সক্রিয় সহযোগিতায় নামে বেনামে মেহেদী হাসান ইতিমধ্যে কয়েক একর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। মেহেদির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল মেরিন কর্পোরেশন এ পর্যন্ত কয়টি কাজ করেছে এবং এনএমআই চট্টগ্রাম থেকে কত টাকা বিল নিয়েছে তার হিসাব চট্টগ্রাম এজি অফিসে তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে।