ধামাকা শপিং ডট কম-এর কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই। গ্রাহকের টাকায় তারা ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে কমপক্ষে ৭৫০ কোটি টাকা। আজ বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে প্রতারণা ও অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানায় দায়ের করা একটি মামলায় ধামাকা শপিংয়ের সিইও মো. সিরাজুল ইসলাম রানাসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তার বাকি দু’জন হচ্ছেন- ধামাকা শপিংয়ের মোবাইল ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ক্যাটাগরি হেড ইমতিয়াজ হাসান সবুজ (৩১) ও ইলেক্ট্রনিক্স ক্যাটাগরি হেড ইব্রাহিম স্বপন (৩৩)
কমান্ডার মঈন জানান, ধামাকা শপিং ডট কম এর সিইও পদে মো. সিরাজুল ইসলাম রানা, ক্যাটাগরি হেড (মোবাইল ফ্যাশন ও লাইফ স্টাইল) পদে ইমতিয়াজ হাসান সবুজ এবং ক্যাটাগরি হেড (ইলেক্ট্রনিক্স) হিসেবে ইব্রাহীম স্বপন নিযুক্ত ছিলেন। ২০১৮ সালে ‘ধামাকা ডিজিটাল’ পরবর্তীতে ২০২০ সালে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ নামে তাদের কার্যক্রম শুরু হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা ২০২০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত এবং ২০২০ সালের অক্টোবর হতে প্রতিষ্ঠানটি নেতিবাচক এগ্রেসিভ স্ট্রাটিজি নিয়ে মাঠে নামে।
গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে কমান্ডার মঈন বলেন, ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ এর কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই; ব্যবসায়িক একাউন্টও নেই। ব্যবসা পরিচালনায় ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের একাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার লেনদেন করলেও অ্যাকাউন্টে রয়েছে এক লাখ টাকারও কম। বর্তমানে সেলার বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৮০-১৯০ কোটি টাকা, কাস্টমার বকেয়া ১৫০ কোটি টাকা এবং কাস্টমার রিফান্ড চেক বকেয়া ৩৫-৪০ কোটি টাকা।
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের অফিস এবং ডিপো ভাড়া বকেয়া রয়েছে। জুন থেকে কর্মচারিদের বেতন-ভাতাও বকেয়া। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু করে, যার ফলে বর্তমানে ধামাকার প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
মহাখালীতে তাদের প্রধান কার্যালয় এবং তেজগাঁও বটতলা মোড়ে একটি ডেলিভারি হাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬শ’টি ব্যবসায়িক চেইন রয়েছে। এরমধ্যে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে।
ধামাকার পরিচালনা পর্ষদের ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড, মাইক্রোট্রেড ফুড এবং বেভারেজ লিমিটেড এবং মাইক্রোট্রেড আইসিক্স লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রাহক চেইন বা নেটওয়ার্ক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ছিল ধামাকার কৌশল। এ ছাড়া, ‘হোল্ড মানি প্রসেস প্লান’ অর্থাৎ গ্রাহক ও সরবরাহকারীর টাকা আটকে রেখে অর্থ সরিয়ে ফেলা ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ধামাকার গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখের বেশি। প্রতিষ্ঠানটি এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করে অর্থ সরিয়ে গ্রাহকদের চেক প্রদান করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহকের বকেয়া রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অক্টোবর থেকে তারা অ্যাগ্রেসিভ বিজনেসে যায়। ধামাকা খুব অল্প সময়েই প্রচুর টাকা সরিয়ে ফেলে। তাদের ১৪টি একাউন্ট ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিআইডির তদন্তেও ১১৬ কোটি টাকা অস্বচ্ছতার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাণিজ্য মন্তণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করেছে। যাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অর্থ সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ গ্রাহকরা যে টাকা দিয়েছে তা গেছে ইনভেরিয়েন্ট টেলিকমের একাউন্টে। ধামাকার মালিকদের আরও অনেক ব্যবসা রয়েছে। সেসব ব্যবসায় সেই টাকা স্থানান্তর করা হতে পারে। এ ছাড়া মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতির নিজস্ব সম্পদ রয়েছে ২৫০ কোটি টাকার ওপরে, সেখানেও ধামাকার গ্রাহকদের টাকা যেতে পারে।
ধামাকার মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতি কোথায় জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি পলাতক, আমরা জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের মাধ্যমে জেনেছি তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। আমরা তাকেসহ অন্যান্য আসামিদের খুঁজছি।

