নিজস্ব প্রতিবেদক : বইমেলা ইতিহাস সৃষ্টি করবে। এবারের বই মেলা হবে একটি আদর্শ বইমেলা। মেলায় এসে সবাই চমৎকৃত হবেন। স্বস্তিতে ঘুরতে পারবেন। বইমেলা শুরুর একদিন আগে এমন মন্তব্য করলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। শনিবার সকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অমর একুশে গ্রন্থমেলার বিস্তারিত তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলণের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রনজিৎ কুমার বিশ্বাস। বাংলা একাডেমির সচিব আলতাফ হোসেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ। বইমেলার পৃষ্ঠপোষক টেলিটকের মহাব্যবস্থাপক(বিক্রয় ও বিপণন) শাহ আলমসহ স্টেপ মিডিয়ার কর্মকর্তারা।
শামসুজ্জামান খান বলেন, আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে গৌরবের অমর একুশে বইমেলা। একই সঙ্গে সাহিত্য সম্মেলণ। বইমেলা বাংলাদেশের সভ্যতার পরিচয় দেয়। সংস্কৃতি জাগরণের মূল অনুঘটক বই। বই জাতিকে বিশেষ অবস্থানে উন্নীত করে। বইমেলা স্বাধীনতার শক্তিকেও জাগিয়ে তোলে। গোটা জাতির আশা আকাঙ্খা পুরণের লক্ষ্যে বইমেলার আয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বছরের মত দ্বিতীয়বার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দু জায়গা মিলে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বইমেলা চলবে। মেলার সময় সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সকাল ১১টা থেকে রাত সাড়ে আটটা। সপ্তাহের অন্যান্য দিন দুপুর তিনটা থেকে রাত সাড়ে আটটা। বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে ৯২টি প্রতিষ্ঠানের ১২৮টি ইউনিট বসবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুইশ ৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে চারশ ৩৭টি ইউনিট বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে।
বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্র থাকবে। বর্ধমান ভবনের উত্তর পাশে বরাবরের মতই মিডিয়া সেন্টার। প্রতিবারের মত এবছরও নজরুল মঞ্চে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নজরুল মঞ্চকে ঘিরে শিশু কর্ণার করা হয়েছে। পাশাপাশি অমর একুশে গ্রন্থমেলার উভয় অংশে বিনামূল্যে ওয়াইফাই ইন্টারনেট সুবিধা থাকছে।
একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দুজাগায়ই লেখক কুঞ্জ থাকবে। ৭২টি লিটল ম্যাগাজিনকে বর্ধমান ভবনের দক্ষিণ পাশে জায়গা দেয়া হয়েছে। এছাড়া মেলার অবকাঠামোতে নান্দনিকতা আনা হয়েছে। আলোকসজ্জ্বা, ফুলের বাগান ও বসার জায়গা রাখা করা হয়েছে। গ্রন্থমেলার প্রবেশপথে আর্চওয়ে দিয়ে মেলায় প্রবেশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তাকর্মীবৃন্দ।
পাশাপাশি নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলা প্রাঙ্গণে থাকবে ৭৫টি ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের একটি পথ এবং টিএসসি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন দিয়ে মেলা থেকে বের হওয়ার দুটি পথ থাকবে। গ্রন্থমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে। দুটি স্টল-ওয়ারি একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপক কর্মী থাকবেন। ইতোমধ্যে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে স্টলের কর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
স্বচ্ছন্দে চলাফেরার সুবিধার্থে স্টলের সামনের চলাচল-পথে কমপক্ষে ২০ফুট করে উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়েছে। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও এর পাশ্ববর্তী জলাধারকে নান্দনিকভাবে গ্রন্থমেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যাতে স্বাধীনতার স্তম্ভের আলোক-বিচ্ছুরণে মেলা প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে ওঠে। এছাড়া ইতোমধ্যে বাংলা বর্ণমালা ও ভাষা শহিদদের প্রতিকৃতি ও মহান ভাষা আন্দোলনের তথ্য সংবলিত নানান স্মারকে মেলা প্রাঙ্গণকে একুশের চেতনায় সজ্জিত করা হয়েছে।
গ্রন্থমেলা চলাকালে বাংলা একাডেমির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সকালের অধিবেশনে সৈয়দ শামসুল হক সাহিত্য সম্মেলনের ‘ধারণাপত্র উপস্থাপন করবেন। এছাড়া সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তিনটি বিষয়ে তিন দিনব্যাপী দুটি করে অধিবেশনে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। ২ ফেব্রুয়ারি কথাসাহিত্য বিষয়ক অধিবেশনে প্রবন্ধ পাঠ করবেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ৩ ফেব্রূয়ারি কবিতা বিষয়ক অধিবেশনে প্রবন্ধ পাঠ করবেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং ৪ ফেব্রুয়ারি নাটক বিষয়ক অধিবেশনে প্রবন্ধ পাঠ করবেন রামেন্দু মজুমদার।
৫ ফেব্রয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ এবং বিস্মৃতপ্রায় বিশিষ্ট বাঙালি মনীষার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান, আবৃত্তি এবং উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০১৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০১৪ গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হবে।
এছাড়া ২০১৪ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে প্রথমবারের মতো ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এবছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলায় এবার ৪ দিন শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হবে। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ১০০টির বেশি নতুন বই পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, ইকুয়েডরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ভাষার প্রায় পঞ্চাশজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাহিত্য-সমালোচক অংশগ্রহণ করবেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, হান্স হার্ডার, ফাদার দ্যতিয়েন, মারিয়া বারেরা হেলেনা, তবিয়াস বিয়ানওনে, দাতু ড. আহমেদ কামাল আবদুল্লাহ, জার্মেইন ড্রুগেনব ব্রুট, সিন্ডিলি ব্রাউন, পিটার নাইবার্স, জামি ঝু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, নবনীতা দেবসেন, উদয় নারায়ণ সিংহ, কবি উৎপলকুমার বসু, কবি সুবোধ সরকার প্রমুখ। উল্লেখ্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের পাশাপাশি ত্রিপুরা, আসাম এবং বিহারের মৈথিলি ও ভোজপুরি ভাষার বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকও এ সাহিত্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন।

