নিউজ ডেস্ক : ‘ইনসাইড মি ভেরি ইমোশনাল, আউটসাইড অ্যাম ভেরি হ্যাপি’ সংলাপটি বলিউড অভিনেতা ইরফান খানের। যিনি প্রয়াত হয়েছেন গতকাল। ‘আংরেজি মিডিয়াম’ সিনেমায় বাবার চরিত্রে অভিনয় করে এই সংলাপ বলেছিলেন তিনি। মধ্যবিত্ত ইংরেজি না-জানা বাবার ইংরেজির দৌড় ছিল এতোটুকুই। সাধারণ কণ্ঠে সংলাপ বলে স্টেজ ছেড়ে নেমে যাওয়ার সেই দৃশ্যে অনেক বাবাই নিজেকে ইরফানের চরিত্রে দেখতে পাবেন।
আইফা অ্যাওয়ার্ডের এক অনুষ্ঠানে ইরফান খান শাহরুখ খানকে বলেছিলেন, ‘মুভি তো ব্লকবাস্টার হবে বাজিগর, ডন, বাজরাঙ্গী ভাইজান। এগুলো নিয়ে কথা বলছো, আলোচনায় দ্যা লাঞ্চ বক্স কই?’
অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে কিছুটা মজা দেওয়ার জন্যেই এটা করা হয়েছিল। সেসময় শাহরুখ খান এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমরা কমার্শিয়াল ফিল্ম করি। কিন্তু রিয়েলিস্টিক অভিনয় কীভাবে করতে হবে সেটা আপনার কাছ থেকেই শিখি।’
ইরফান খান অভিনয় করেছেন জীবনঘনিষ্ট সিনেমাগুলোতে। এসব সিনেমায় কৃত্রিম সংলাপের চেয়ে তার কণ্ঠে, চেহারায় মানুষ দেখেছে রিয়েলিস্টিক খুশি, বিষণ্ণতা, হাসি, কান্না। বলিউডে যখন সিক্স প্যাকের সালমান খানের মতো শরীর, শাহরুখের রোমান্টিক চাহনি কিংবা আমির খানের মতো ব্যক্তিত্ব বদলানোর ক্ষমতা দিয়ে বাকিরা অভিনয় করে গেছেন, তখন ইরফান করে গেছেন শহরের আটপৌরে মানুষকে তুলে ধরার অভিনয়। এ কারণেই বড় বড় সিনেমায় অভিনয় না করেও তিনি আলোচিত অভিনেতা।
এক সাক্ষাৎকারে ইরফান খান বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের অভিনেতার ক্ষেত্রে ‘নিয়তি’ শব্দটি একটি বড় বিষয়। এখানে পরিবেশ তোমাকে বিধ্বস্ত করে দিতে পারে। যে মানুষটাকে কিছু দিন আগেও তোমার দেখে মনে হতো দুর্দান্ত, উৎসাহে টইটুম্বুর, তাকে হঠাৎ দেখে মনে হবে তার চোখ দুটো নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছে, যে ক্যারিশমা লোকটার মধ্যে দেখেছিলাম, তা যেন বিলীন হয়ে গিয়েছে।’
ইরফান তার এই সাক্ষাৎকারে ‘নিয়তি’ শব্দটিকে নির্দিষ্ট করেননি, অভিনেতার নিয়তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘জরা’ ও ‘মৃত্যু’ শব্দ দুটিকেও তিনি যেন আলতোভাবে বলে ছেড়ে দেন। ইরফান খান এমনই। যার সবকিছুই বড় বেশি সাধারণ, বড় বেশি আটপৌরে।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই আটপৌরে সাধারণ জীবনের ইতি ঘটেছে। যাকে আপনার মনে হবে পাড়ার কোন গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ, কিন্তু তার অভিব্যক্তিতে আপনি নিজেকে দেখতে পান। মৃত্যু হয়েছে তেমনই একজন আপনার, আমার সেলুলয়েড প্রতিনিধির।
আরেক সাক্ষাৎকারে ইরফান খান বলেছিলেন, ‘আমাকে লোকে জানুক আমি চেয়েছিলাম। আমি বড়লোক হতে চেয়েছিলাম। আমার দিকে লোকে তাকিয়ে দেখুক আমি চেয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে কথা হোক আমি চেয়েছিলাম। আর যখন সেগুলো সত্যি সত্যিই হতে শুরু করল, আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম যে আমি আসলে এগুলো থেকে পালাতে চাই। আগন্তুকদের আদিখ্যেতা, তাদের ‘আমাকে চেনা’ হাবভাব বা তাদের বলা প্রশংসাবাক্য আমি কিছুতেই সিরিয়াসলি নিতে পারি না।’
গেল ৪ বছর ধরেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়ে গেছেন। এর ফাঁকে অভিনয়ও চালিয়ে গেছেন। অসুখটাকে জয় করার স্বপ্ন দেখতেন ইরফান। তিনি সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন জীবনটাকে জয় করার ইচ্ছাটাকে। কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে। তবে মৃত্যুতেও তিনি জয় করেছেন জীবন। এমন বিজয় পাবার সৌভাগ্য কয়জনের হয়? বলে বলে জীবনকে নিয়ে অত সহজ করতে পারে কয়জন? কয়জন বলতে পারে, ‘ভেতরের আমি আবেগপূর্ণ, কিন্তু বাইরে আমি সুখি!’

