স্পোর্টস ডেস্ক : রংধনুর সাত রং। মেঘেরও রং অনেক। একটি ক্রিকেট ম্যাচেও খেলা করে অনেক রং। কখনও উত্থান, কখনও পতন আবার কখনই অবিশ্বাস্য আশা জাগানিয়া পারফর্ম্যান্স বদলে দেয় ম্যাচের মোড়। বাংলাদেশের প্রতিটি স্মরনীয় জয়েই রয়েছে একটা করে মনে দাগ লাগা দৃশ্য। শত চেষ্টা করেও যে দাগ মুছে ফেলা যায় না। এমনকি আরেকটি বড় জয়ের পরও চোখের পাতায় খেলা করে সেই অমর ছবি। বুধবার পাকিস্তানের বিপক্ষে আরেকটি স্মরনীয় জয়ে সেই দৃশ্য কোনটা? এমন প্রশ্নে অনেকেই হয়তো রেগে যাবেন! বলবেন, ‘নবজাত শিশুও এতোক্ষণে যেনে গেছে, বাহুল্য প্রশ্ন বটে!’
এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সুপার ফোরের শেষ ম্যাচ, অথচ সেটা হয়ে যায় অলিখিত সেমিফাইনাল। পুরো টুর্নামেন্টে উত্থান-পতনের গল্পটা এ ম্যাচেও এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। বারবার রং বদলের এই ম্যাচেও শুরুটা রাঙিয়েছিলেন দুই ‘ম’ মোহাম্মদ মিঠুন ও মুশফিকুর রহিম। বোলিংয়ের শুরুতে সেটা চলে যায় আরও দুই ‘ম’ মেহেদী হাসান মিরাজ ও মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে। ‘ম’ এর রাজত্বের শেষটা করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ইমাম-উল-হককে আউট করে। তাহলে সেই দাগ কাঁটা অমর দৃশ্যটা কই?
বয়স ৩৫ ছুঁইছুঁই, হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের সংখ্যাটাও তো জানা, সাতটি! বাস্তবে তো একজন তরুণ। পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে জোড়া লাগানোর কাজটা তো নিয়মিতই করে আসছেন শোয়েব মালিক। এদিনও ছিলেন সেই পথে। রুবেল হোসেনে চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে মিডউইকেট দিয়ে চিপ করতে চেয়ছিলেন শোয়েব, বলও ব্যাটের মাঝে লাগে, ধারাভাষ্যকর অবিশ্বাস্য শট বলা শেষ না করেই বলেন ‘সুপারম্যান’। ব্যাট লাগার পর .০৮৪ সেকেন্ট সময়ের মধ্যেই বাজপাখির মতো ছো মেরে শিকার ধরে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মধ্যে তখন সাদা রংয়ের ‘কোকাবুরা। যেন ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’। অনেকের চোখেই এখনও ঘোর লেগে আছে। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সেটাই সত্যি! তিনি যে মাশরাফি বিন মুর্তজা। এই ক্যাচেই যে মোড় ঘুরে গেছে ম্যাচের। জয়ের দূর্গম পথটা পাড়ি দেয়ার জন্য দ্রুতগতির ট্রেনেও চেপে উঠতে পারে বাংলাদেশ।
ক্যাচ নেয়ার পরই মাঠ ছাড়তে হয় মাশরাফিকে। চিকিৎসকরা দিয়ে দেন আঙুলে ব্যান্ডেজ। আর কেউ হলে হয়তো মাঠের বাইরেই থাকতেন তিনি। কিন্তু এ যে অধিনায়ক। দলের নেতা। মর্যাদার লড়াইয়ে সৈন্যদের একা রেখে কিভাবে হালকা চোট নিয়ে যুদ্ধের ময়দান ছাড়বেন তিনি? ছাড়েননি। আবার ফিরছেন ফিল্ডিংয়ে। বল ধরার সময় যে হাতে কষ্ট হচ্ছিল সেটাও দেখে সহজে বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু নিজের কষ্টটা আড়াল করেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাকে দেখেই পুরো বাংলাদেশের দলের ফিল্ডিংয়ে আমুল পরিবর্তন দেখা যায়। গতি বেড়ে যায় ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত এক বাংলাদেশ। ম্যাচে নামার আগে তো এই বাংলাদেশকেই দেখতে চেয়েছিলেন মাশরাফি।
মাঠে নামার আগেই দলের মধ্যে জয়ের মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে মুশফিকুর রহিম জানান সাকিব না থাকার পর মাশরাফি কিভাবে দলকে উজ্জিবীত করেন। তিনি বলেন, ‘মাশরাফি ভাই একটা কথা বলেছিলেন মাঠে নামার আগে। ‘যুদ্ধে নামলে পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। লড়াইয়ে নেমে গা বাঁচিয়ে চললে হবে না। হয় মারব, না হয় মরবো।’
প্রতি ম্যাচের আগে, ম্যাচের মধ্যে এই কাজটা যে তার করতেই হয়। কিন্তু দলের সেরা দুই পারফরমার তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানকে ছাড়া কিভাবে বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেবেন। বৈঠা ছাড়াও যে বিশাল সমুদ্র পাড় হওয়া যায় সেটা তো অনেকবারই বুঝিয়েছেন মাশরাফি। সেটা নতুন করে বুঝালেন এশিয়া কাপে। দেশ ছাড়ার আগেই সবাইকে বলেছিলেন, আমরা সেখানে তামাশা দেখতে যাচ্ছি না, শুধু খেলার জন্যই যাচ্ছি না। এই শিরোপাটা আমাদের চাই-ই-চাই।’
টুর্নামেন্টে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে বিশাল ব্যবধানে হারের পর অনেকই শিরোপার স্বপ্নটাকে নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তবে কল্পনাকে সত্যি করাই তো একজন সত্যিকারের নেতার কাজ। পাকিস্তানকে হারিয়ে একটি জয়েই সেই স্বপ্নের শিরোপা ছোঁয়ার খুব কাছে চলে গেছে বাংলাদেশ। ঝা চকচকে সেই ট্রফিটা এখন হাতছোঁয়া দূরত্বে। দরকার আর একটি জয়। দরকার নেতার আরও একটি নেতৃত্ব। একটি ইংরেজি অনলাইনে এক পাঠক লিখেছেন, ‘মাশরাফি আছে না!’

