হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর হবিগঞ্জের পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া গউছকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রোববার সকালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গউছ হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক এ আদেশ দেন।
গউছের আইনজীবী নূর ইসলাম জানান, সকালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গউছ হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। শুনানি শেষে বিচারক রোকেয়া আক্তার জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এদিকে আদালতের বাহিরে থাকা বিএনপির সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসময় সদর থানার ওসি নাজিম উদ্দিনসহ ২০ জন আহত হয়েছে। শহরের প্রধান সড়কে বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে উত্তেজিত সমর্থকরা। পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে আনে।
সহকারী পুলিশ সুপার শহিদুল ইসলাম জানান, জিকে গউছকে কারাগারে নেয়ার সময় বিএনপি কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তিনি জানান, বিএনপির হামলায় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
এর আগে ২১ ডিসেম্বর এ মামলায় নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক আদালতের বিচারক রশিদ আহমেদ এই মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল উসজিহাদের নেতা মুফতি হান্নান সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জের পৌর মেয়র জিকে গউছ, মুফতি সফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মোহাম্মদ আলী, বদরুলসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এর আগে ২০০৫ সালে চার্জশিট ও ২০১১ সালে দুবার সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হয়। ওই সময় বাদীপক্ষ নারাজি দিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিলে আদালত আবারও চার্জশিট প্রদানের নির্দেশ দেয় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। ২০০৫ সালে কলঙ্কজনক এ ঘটনাটি ঘটার পর বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের গণমাধ্যমসমূহে বিষয়টি তুমুল সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় তোলে। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের সচেতন মহল কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত দু’টি মামলার ৯ বছরেও বিচারকার্য শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন হবিগঞ্জ তথা সারা দেশের মানুষ। বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন কিবরিয়া পরিবার।
২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জ গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, তার ভাইপো শাহ মঞ্জুরুল হুদাসহ ৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পরদিন দিন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বর্তমানে হবিগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান বাদী হয়ে হবিগঞ্জ সদর থানায় ১টি হত্যা ও ১টি বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও বিস্ফোরক মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এম সফিউজ্জামান নিযুক্ত হন। ঘটনার পর সিলেট রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি একেএম মাহফুজুর রহমানকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটির অপর সদস্যরা ছিলেন র্যাবের ইন্টেলিজেন্ট উইংয়ের তৎকালীন পরিচালক লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ (পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহে নিহত), সিআইডির সিলেট বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুর রহিম, র্যাব কর্মকর্তা তারেক, মেজর মামুন ও সিআইডির সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান। কমিটি ২০০৫ সালের ১৩ই মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মুহম্মদ ওমর ফারুকের কাছে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করে। তদন্ত রিপোর্টে কি ছিল তা সে সময় প্রকাশ করা হয়নি।
পরবর্তীকালে হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুন্সি আতিক ৫২ দিন তদন্ত শেষে ২০০৫ সালে ২০শে মার্চ তৎকালীন শহীদ জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি একেএম আবদুল কাইউম, শহীদ জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি একেএম আবদুল কাইয়ুম, যুবদল নেতা জয়নাল আবেদীন জালাল, জমির আলী, তাজুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন মুমিন, সাহেদ আলী, সেলিম আহমেদ, আয়াত আলী, মুহিবুর রহমান, কাজল মিয়াসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। কিন্তু মামলার বাদী অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ খান আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিট অসম্পন্ন দাবি করে অধিকতর তদন্তের আবেদন জানান। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপির আমলের চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হলে আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ প্রদান করে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে।

