নিজস্ব প্রতিবেদক : চারদিকে উৎসবের ছটা, আনন্দ আর মহামিলনের পদধ্বনি। এই মধ্যরাতেও জেগে আছে শহর, উৎসবের প্রাক্কালে গ্রাম-গ্রামে বসেছে বাড়িফেরা মানুষের গল্প, আর আড্ডা। এই উদযাপনের সব মনোযোগ ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে। রাত পেরোলেই বাংলাদেশের ঘরে-ঘরে শুরু হবে ঈদের আয়োজন। ঈদের নামাজ শেষে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি হবে পশু। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই নিজেদের মধ্যে এই আনন্দ উপভোগ করবে।
কোরআনে সূরা কাওসারের দুই নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করো ও পশু কোরবানি করো।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বলা হয়েছে, ‘মনের পশুরে কর জবাই পশুরাও বাঁচে বাঁচে সবাই।’ ধর্মীয় ও সমাজসংশ্লিষ্টরা বলছেন— ধর্মীয় ও ঐতিহ্য অনুসারে ঈদুল আজহা একটি বড় উৎসব— সারা দেশ একাত্ম হয়ে ওঠে মানুষে-মানুষে। জয়ী হয় মানবিকতা। আর ধর্মে রয়েছে বিস্তর তাৎপর্য। একমাত্র সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশেই পশু কোরবানি হতে হবে, তার সন্তুষ্টি অর্জনই হতে হবে একমাত্র লক্ষ্য।
পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে শহর থেকে গ্রামে শিশু-কিশোর আর তরুণদের বিরাজ করছে বাড়তি আনন্দ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আনন্দের বিচিত্র চিত্র। কোরবানির পশুর প্রতি বাড়তি যত্ন-আত্মি আর পশুকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের গল্প চলছে মুখে-মুখে। সড়কে কোরবানির উদ্দেশ্যে মানুষের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি— দাম কত? ঈদের সকালে এই চিত্র নেবে ভিন্নরূপ। কোরবানি দেওয়া হবে পশু, ভাগ হবে মাংস। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা বলছেন— কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগে ভাগ করা উত্তম। একভাগ দরিদ্রদের, একভাগ যিনি কোরবানি দেবেন তার, আরেক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বরাদ্দ করা ভালো। সর্বোপরি, কোরবানির মূল শিক্ষা হচ্ছে— আত্মত্যাগের শিক্ষা। এই শিক্ষায় মহীয়ান হয়ে ওঠবে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
ধর্মীয় গ্রন্থ মতে, প্রায় চার হাজার বছর আগে মুসলমানদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) সবচেয়ে প্রিয় তার। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে আদরের ছেলে ইসমাইলকে কোরবানি করার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে একটি দুম্বা কোরবানি হয় ইসমাইলের বদলে।হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমা স্মরণে মুসলমানরা প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভে তার পথে পশু কোরবানি করেন।
বাংলাদেশের প্রবীণ আলেম শায়খুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী বলেন, ‘কোরবানির উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এর বাইরে কিচ্ছু না। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব না, তারাও যদি কোরবানি দেয়, তাদের উদ্দেশ্য থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।’
মাওলানা আশরাফ আলী আরও বলেন, ‘কোরবানির মাংস তিনভাগে ভাগ করে দেওয়া উত্তম। একভাগ নিজের রেখে, বাকি দুইভাগ আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া ভালো।’
বিশ্বব্যাপী মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা ঈদুল আজহাকে অন্যতম প্রধান উৎসব হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাঙালিদের উদযাপন ভিন্ন। ইতিহাসের বিভিন্ন জায়গায় ঈদের বর্ণিল উদযাপনের তথ্য পাওয়া যায়। রাজধানীতেও ঈদের আনন্দ উদযাপনে নানা চাকচিক্য আছে। কালে-কালে এই উদযাপনে সময়ের ছোঁয়া লেগেছে।
সামাজিক গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে ড. শামসুজ্জামান খানের ভাষ্য— ‘উৎসব হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতির প্রধান অনুষঙ্গ। মানুষে-মানুষের মিলন তো শুভ এবং কল্যাণকর। কারণ, মানুষ মেলামেশা না করলে বিচ্ছিন্নতাবোধ হয়, এতে করে আশাহীনতা তৈরি হয়, বিষাদের সৃষ্টি হয়, নৈরাশ্যের সৃষ্টি হয়, কখনও-কখনও মানুষ সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেজন্যই ঈদের দিনের মেলামেশা এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের হৃদ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে।’
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ইতোমধ্যে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক-পৃথক শুভেচ্ছা বাণীতে দেশবাসীকে সিক্ত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক রাজনীতিকরা।
ঈদ মানেই বিভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। কবি নজরুলের কবিতায়— ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক/দোস্ত দুশমন পরও আপন/সবার মহল আজি হউক রওনক/যে আছ দূরে যে আছ কাছে/সবারে আজ মোর সালাম পৌঁছে’ মতো করে ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক সৌহার্দ্যের বার্তা।
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, জাতীয় ঈদগাহসহ মসজিদে-মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বৃষ্টি হলে বিকল্প হিসেবে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। বরাবরের মতো দেশের বৃহৎ জামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের সোলাকিয়া ঈদগাহে। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে তৎপর।

