নিজস্ব প্রতিবেদক : মুন্সীগঞ্জের নাটেশ্বর এলাকাকে মহেঞ্জোদারোর মতো করে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।তিনি বলেন, দেশের ঐতিহাসিক এই স্থানকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এটা খুব দ্রুত করা হবে। যাতে পরবর্তী বাজেটে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়।
মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শনের উন্মোচনকালে একথা বলেন অর্থমন্ত্রী। উন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নুহ-উল-আলম-লেনিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা এবং চীনের কয়েকজন প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ।
দেশের সর্ববৃহৎ এই বৌদ্ধ সভ্যতার স্মৃতিস্তম্ভের সন্ধান মিলেছে জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বরে । বৌদ্ধ সভ্যতায় স্তুপ হিসেবে চিহ্নিত ওই স্মৃতিস্তম্ভের একেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ মিটার। ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের ওই স্তম্ভগুলো অনেকটা পিরামিড আকৃতির। বিক্রমপুর থেকে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য প্রত্নবস্তু বিশেষ করে মূর্তি ও ভাস্কর্য পাওয়া গেলেও পদ্ধতিগত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হয়নি কখনো।
জানা গেছে, বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে বৌদ্ধ শাসনামলের রাজধানী যে বিক্রমপুর এলাকা ছিল, তারও কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। সড়ক, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু স্থাপনার সন্ধান মিলেছে এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের স্থানে। এর আগে দেশের সবচেয়ে বড় স্তুপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল কুমিল্লার ময়নামতিতে। সেটির আয়তন ছিল ১২ থেকে ১৪ মিটার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি দেখে আমার ১৯৫৬ সালে দেখা মহেঞ্জোদারো সভ্যতার কথা মনে পড়ছে। নাটেশ্বরের এই স্থাপনাগুলোকে মহেজ্ঞোদারোর মতো সুন্দর করে সাজাতে হবে। যাতে এটি দেখে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পারে। অনুষ্ঠানে অগ্রসর বিক্রমপুরের উদ্যোক্তা নুহ-উল-আলম-লেলিন বলেন, বাংলাদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম এই বিক্রমপুর। এটি ছিল বৌদ্ধ শাসনামলে বাংলার রাজধানী। আমাদের এই নিদর্শনকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে হবে। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
চীন থেকে আসা ১৮ জন প্রত্নতাত্ত্বিকের একটি দলও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে ঐতিহ্য অন্বেষণ (প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র) বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা কাজ শুরু করে। উয়ারী বটেশ্বরে বাংলার প্রাচীন সভ্যতার অনুসন্ধানকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ওই প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজটি করা হচ্ছে।
বৌদ্ধধর্মের অন্যতম সাধক অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি প্রাচীন বজ্রযোগিনী এলাকা, যা বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজটি করা হয়। সেখানে এ পর্যন্ত মোট ছয়টি বৌদ্ধবিহার, একটি মণ্ডপ ও একটি পঞ্চস্তুপ আবিষ্কৃত হয়। ২০১৩ সাল থেকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বর দেউলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। প্রায় ১০ একর ঢিবিতে খনন কাজ শুরু করে ঐতিহ্য অন্বেষণ। কিন্তু কাজের বিশালতা ও সংরক্ষণের কথা চিন্তা করে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন সহযোগিতার জন্য চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটকে আমন্ত্রণ জানায়।
২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ওই খননের সময়সীমা ধরে কাজ এগোতে থাকে। যৌথ উদ্যোগে পাঁচ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকায় খনন হয়েছে। প্রায় ৪০ জন প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন সময় সেখানে কাজ করেছেন। ইতিমধ্যে সেখানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তুপ, তিনটি অষ্টকোনাকৃতি স্তুপ, ইটনির্মিত চারটি সড়ক, চারদিকে চারটি স্তুপ এবং হলঘর পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অষ্টকোনাকৃতির কেন্দ্রীয় স্তুপ পাওয়া গেছে।
খনন কাজের দলনেতা অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর প্রত্নস্থান দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব প্রত্নতত্ত্বে জায়গা করে নেবে। নাটেশ্বর দেউলে সাম্প্রতিক আবিষ্কার শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে এটি সেরা আবিষ্কার।
জানা গেছে, ৭৮০-৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ যা শুরু হয়েছিল দেব রাজবংশের সময় (৭৫০-৮০০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং টিকেছিল চন্দ্র রাজবংশের (৯০০-১০৫০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রথমদিক পর্যন্ত। নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দ্বিতীয় পিরিয়ড হলো ৯৫০-১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যা চন্দ্র, বর্ম (১০৮০- ১১৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং সেনদের (১১০০-১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ) শাসন পর্যন্ত টিকেছিল। তাম্র শাসন অনুসারে চন্দ্র, বর্ম ও সেনদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বিক্রমপুরের নাম পাওয়া যায় তিব্বতের ঐতিহাসিক সূত্রে।

