নিজস্ব প্রতিবেদক : নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন উচ্চ সারির আইনজীবীরা।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম. আমির উল ইসলাম বলেন, ‘প্রকাশিত গেজেটের গোড়াতেই গলদ রয়েছে। আমি অবাক হয়েছি, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনকে সরকার আইন মন্ত্রণালযের অধীনে নিয়ে গেছে। এটা করা উচিত ছিলো সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কিন্তু তা না করে ১৩৩ অনুযায়ী বিধি করা হয়েছে। যদিও এই ১৩৩ বিধি প্রযোজ্য হয় প্রজাতন্ত্রের সরকারি কর্মচারীদের জন্য।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধান যে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করেছে সেই জায়গায় রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয় প্রতিস্থাপিত হতে পারে না। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আইন মন্ত্রণালয় পালন করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘অধস্তন আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদেরকে সরকারি গণ-প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসেবে অর্ন্তভূক্ত করা সঠিক হয়নি। মাসদার হোসেন রায়ের আলোকে এবং সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট নিয়ে অধস্তন আদালতকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু এ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সে জায়গা থেকে সরে গেছে। এর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে গেছে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গেজেট প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিব্রতকর অবস্থার পরিসমাপ্তি হয়েছে। শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মাঝখানে আমাকেই অবস্থান নিতে হয়। যাকে বলে সেতুবন্ধন। বারে বারে আমাকে সময় নিতে হয়েছে। সেটা আমার জন্য নিশ্চয়ই বিব্রতকর ছিল। আমার সেই বিব্রতকর অবস্থার পরিসমাপ্তি হয়েছে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল সার্ভিস রুল বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থাৎ বিচারকদের অভিযোগ, অনুসন্ধান কীভাবে হবে, অনুসন্ধানের পর এদের সাময়িক বরখাস্ত কীভাবে হবে এবং এদের অপরাধের তদন্ত কীভাবে হবে সব ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে এ্ই বিধিমালায় উল্লেখ করা আছে।’
বিভিন্ন পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে। সেটারই প্রতিফলন এই বিধিমালায় ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যে কোন পদক্ষেপই নেন না কেন সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে হবে। এটা স্পষ্টভাবে বলা আছে, যখন কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হবে, কারো বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, অভিযোগ অনুসন্ধান করা দরকার বা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দরকার সেখানেও রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। সাময়িক বরখাস্ত করা হবে তখনও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করবেন।’
এই গেজেট হওয়ায় আপনি কিছুটা ভারমুক্ত হয়েছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই। যেহেতু শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মাঝখানে আমাকেই অবস্থান নিতে হয়। যাকে বলে সেতুবন্ধন। সুতরাং সুপ্রিম কোর্টের একটি আগ্রহ ছিল এটা এতো দিন হচ্ছে না কেন। আর বারে বারে আমাকে সময় নিতে হয়েছে। সেটা আমার জন্য নিশ্চয় বিব্রতকর ছিল। আমার সেই বিব্রতকর অবস্থার পরিসমাপ্তি হলো।’
আগের খসড়া এবং এখনকার গেজেটের মধ্যে মূল তফাতটা কি ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূল তফাতটা ছিল প্রাক্তণ প্রধান বিচারপতি যেটা চেয়েছিলেন, আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি। সেটা হলো সমস্ত ক্ষমতাটা সুপ্রিম কোর্টের হাতেই থাকবে। সেটা তো সংবিধান বিরোধী একটা অবস্থান ছিল। সংবিধানে আছে রাষ্ট্রপতি করবেন কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে করবেন।
প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিচার বিভাগকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন সেটি এই শৃংখলাবিধির কারণে কি হচ্ছে না ? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো উচ্চতা না। সংবিধান হলো সবার উপরে। সংবিধান অনুযায়ী সব কিছু হতে হবে। একজন ব্যক্তির ইচ্ছাই বড় না। ব্যক্তি থাকবে না, ব্যক্তি মারা যাবে, সংবিধান থাকবে। কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন তিনি সংবিধানের চেয়ে বেশি বোঝেন সেটা কিন্তু ভুল।’
প্রাক্তন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হওয়ায় বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মামলার স্পিরিট ধ্বংস হয়েছে। গেজেটের মাধ্যমে বিচার বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।’
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের নিজ নিজ কার্যালয়ে এই আইনজীবীরা এসব কথা বলেন। প্রসঙ্গত, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করে সরকার।

