রাজশাহী প্রতিনিধি : একাত্তরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ ও গোটিয়া গ্রামে আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ চালানোর অভিযোগে আব্দুস সামাদ মুসা ওরফে ফিরোজ খাঁ ওরফে মুসা রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে সংস্থাটি। মুসার হাতে নিহত পশ্চিমভাগ গ্রামের শহিদ আবদুস সামাদের স্ত্রী রাফিয়া বেগমের দাখিলকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তে নেমেছে সংস্থাটি।
এরই প্রেক্ষিতে সোমবার দিনভর এলাকায় ঘুরে ঘুরে তদন্ত করেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের সদস্যরা। তদন্ত দলের কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিদর্শক ফারুক হোসেন তদন্ত শেষে জানান, এর আগে গত ২৭ জুলাই রাজশাহীর সার্কিট হাউসে এ ঘটনার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এবার ঘটনাস্থল ঘুরে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের প্রথম দিন বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ, আটভাগ, ধোকরাকুল ও গোটিয়া গ্রামে পরিদর্শন করে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য দিয়েছেন মুসার হাতে নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের স্বজনরা।
ফারুক হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল ঘুরে ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে নিঃসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে যে, মুসা একজন যুদ্ধাপরাধী এবং মানুষ হত্যাকারী। এসময় সহকারী তদন্ত কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় প্রবীণ এলাকাবাসীর বর্ণনা ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের আদিবাসীদের সঙ্গে জমি বিনিময় করে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার ইসলামপুর গ্রামের আব্বাস আলীর পুত্র আব্দুস সামাদ মুসা ও তার নিকট আত্মীয়দের নিয়ে পুঠিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আব্দুস সামাদ মুসার বয়স তখন ছিল ২০ থেকে ২২ বছর। ওই বয়সে আব্দুস সামাদ পাকিস্তানের পক্ষে এলাকার যুবকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন।
একাত্তরের ১২ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনী পুঠিয়া আক্রমণ করে মানুষ হত্যা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করলে মুসা হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। তিনি ১৯ এপ্রিল ৩০-৪০ জন হানাদার বাহিনী নিয়ে যান বাঁশবাড়িয়া গ্রামে। সেখান থেকে তারা ২১ জনকে আটক করে। তাদের নিয়ে রাখা হয় গোটিয়া গ্রামের স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের বাড়িতে। সেখানে দিনভর নির্যাতন করে ১৭ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চারজনকে হত্যা করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নূরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি বাঁশবাড়িয়া বাজারে পল্লি চিকিৎসক হিসেবে ওষুধ বিক্রি ও রোগী দেখেন।
নূরুল ইসলাম জানান, তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তার সঙ্গে তার বাবা ইসমাইল হোসেন, বড় ভাই আকরাম আলীকেও আটক করা হয়েছিল। সারাদিন নির্যাতন করে রাত ১০টায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয় চারজনকে।
রাফিয়া বেগমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ও নূরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপুরের নমিক ফকিরের ছেলে মফিজ উদ্দিন, পুঠিয়ার গোটিয়া গ্রামের মানিক সরদারের দুই ছেলে জাফর আলী ও আদম আলী, শুকদেবপুরের মেরা হাজীর ছেলে সিরাজ উদ্দিনকে মুসা চোখ বেঁধে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেন। পরে তিনি হানাদার বাহিনীকে জানান, এরা পাকিস্তানের শত্রু মুক্তিযোদ্ধা। তখন তার নির্দেশে গুলি করা হয়। এরপর তারা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকলে মুসা তাদের হাত পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর মুসার নির্দেশে পশ্চিমভাগ মাদ্রাসার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় আক্কেল আলীর ছেলে আব্দুস সাত্তারকে। এরপর মুসা পশ্চিমভাগ সাঁওতালপাড়ার লাডে হেমব্রমের বাড়িতে গিয়ে অগ্নিসংযোগ করে লুটপাট করেন। মুসা নিজেই তরবারি দিয়ে লাডে হেমব্রমকে হত্যা করেন। এরপর হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মুসা হত্যা করেন মংলা সরেনের ছেলে জটু সরেন ও মুন্সী মার্ড্ডির ছেলে টুনু মার্ড্ডিকে। এরপর পুঠিয়া-তাহেরপুর সড়কে এসে মুক্তিযোদ্ধা বহনের অভিযোগ এনে হত্যা করা হয় ধোকড়াকুল গ্রামের নেসু শাহ’র ছেলে টমটম চালক রহমত শাহকে। এরপর হানাদার বাহিনী তাহেরপুরে চলে গেলে মুসা বাঁশবাড়িয়া এলাকায় অবস্থান নেন।
নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের দেখতে এলে মুসা নিজের তরবারি দিয়ে বাঁশবাড়ি পশ্চিমভাগ গ্রামের ইব্রাহিম সরকারের ছেলে ইসমাইল সরকার, গফুরের ছেলে বদিউজ্জামান, বছিরের ছেলে কালাকে হত্যা করেন। মুসার হাতে নিহত ইসমাইল সরকারের ছেলে আনেস সরকার পিতার জন্য কাফনের কাপড় আনতে গেলে মুসা তাকেও রাস্তার উপর তরবারি দিয়ে হত্যা করেন।
এ ঘটনার পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার পরিবার ও সহযোগীদের নিয়ে ভারতে চলে যান। তার এই বাঙালি ও আদিবাসী নিধনে পাক আর্মির সঙ্গে সহযোগী ছিলেন বর্তমানে ভারতের মুর্শিদাবাদ প্রবাসী আব্দুল খালেক, আব্দুল হামেদ, সাদ আক্কাস, দেল মোহাম্মদ, সলেমান খলিফা ও দেদার আলী।
বাঁশবাড়িয়া আদিবাসী পল্লীর বধুরাই সাধু মার্ডি বলেন, ‘একাত্তর সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম। মুসার নেতৃত্বে আমার চোখের সামনে আমার দাদা টুনু মার্ডি, নানা জটু সরেন, মামা কানু হাজদা ও প্রতিবেশী দাদা লাডে হাজদাকে হত্যা করা হয়। মুসা তলোয়ার দিয়ে তাদের হত্যা করে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।’
পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জিল্লুর রহমান বলেন, ‘একাত্তর সালে আমার বয়স ছিল ১১ বছর। আদিবাসী পল্লির পাশেই আমাদের জমিতে শ্রমিকের জন্য খাবার নিয়ে আসি। তখন দেখতে পাই মুসা রাজাকার তলোয়ার নিয়ে দৌড়ে এসে চান্দু সরেন নামের একজনকে জবাই করে হত্যা করেছে। তারপরে শুনতে পেয়েছি তিনি অনেক গ্রামে আগুন দিয়েছেন। অনেককে হত্যা করেছেন।’
একাত্তর সালে বাঙালি ও আদিবাসী হত্যা ও লুটপাটের পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার ভারতে পালিয়ে যান। এরপর ৭৫ সালে গোপনে দেশে ফিরে আদিবাসী পল্লির ১৫২ বিঘা জমি দখলের চেষ্টায় অপতৎপরতা শুরু করেন।

