নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে যাচ্ছে ভারত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারত বরাবরই একত্রে কাজ করার কথা বলে আসছে। কিন্তু দুদেশের মধ্যে ‘দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি’ না থাকায় বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছিল না। এবার ভারতই উদ্যোগী হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভারত তার পক্ষে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশ একত্রে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা। দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সময়ের চাওয়ায় পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এই দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা হবে। যা দুই দেশের মধ্যে সৈন্য আদান-প্রদান, প্রযুক্তি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ সামরিক মহড়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে সামনাসামনি আলোচনা করতে আগামীকাল বুধবার ঢাকায় আসছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর। তিনি দুদিন ঢাকায় অবস্থান করবেন।
পারিকরের সফরে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে। এ সফর দুদেশের মধ্যে সামরিক সরবরাহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ ও যৌথ সামরিক মহড়া, সেই সঙ্গে সন্ত্রাস দমনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ক অতিরিক্ত সচিব কামরুল আহসান বলেন, মনোহর পারিকরের এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে উন্নয়নের সম্ভাবনা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। পারিকর এ বিষয়ে একটি কর্মকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে আলোচনা করবেন।
এদিকে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ভারত অভিনব অর্থায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে নৌ অফশোর প্যাট্রল জাহাজ (ওপিভিএস) রপ্তানির বিষয়টিও ভাবছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে এই বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
প্রসঙ্গত, বৃহৎ পরিসরে টহল জলযানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, ‘ইনসোর প্যাট্রল ভেসেল’ (আইপিভিএস) এবং ‘অফসোর প্যাট্রল ভেসেল’ (ওপিভিএস)।
এ ছাড়া সামগ্রিক সক্ষমতার আওতায় ভারতের সামরিক স্থাপনায় বাংলাদেশের সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও আলোচনার বিষয়বস্তুতে থাকছে।
ভারত ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সেনাবাহিনী-সেনাবাহিনী সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে। একইভাবে ভারত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, ফ্রান্স, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভারত পারিকরের সফরে এই আলোচনাটি এগিয়ে রাখতে চায়। কারণ ডিসেম্বরেই এ বিষয়ে চুক্তিটি সই হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনের পর নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের সামনে।
মনোহর পারিকরই এযাবৎকালের প্রথম ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফরে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ১৮ ডিসেম্বর দুদিনের সফরে ভারতে যাচ্ছেন। ২০১০ সালের পর এটাই তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর। যদিও ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সহধর্মিণী শুভ্রা মুখার্জির শেষকৃত্যে এবং অতিসম্প্রতি ব্রিকস-বিমসটেক শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে তিনি দুদফা ভারত সফর করেছেন। তবে আসন্ন ভারত সফর হবে তার পরিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর।
এই সফরকে ঘিরে তাই ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে ঢাকা ও দিল্লি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতির লক্ষ্যে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক এরই মধ্যে দিল্লি ঘুরে এসেছেন। প্রথা অনুযায়ী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই ঢাকা সফরের কথা ছিল। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ঢাকায় আসছেন বলে এরই মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরকালে পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য, কানেকটিভিটি ইস্যু প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে প্রায় দুই ডজন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। ভারতের আর্থিক সহায়তায় চলমান বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সৈন্য শাহাদতবরণ করেছেন, তাদের কয়েকজনকে সম্মাননা জানানো হবে।

