ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ফিরে পাচ্ছে পুরনো রূপ। হিন্দু-মুসলমানরা কাজ করছে হাতে হাত রেখে। পাড়ায়-মহল্লায় এখনো পাহারা চলে হিন্দু-মুসলমান মিলে মিশে।
অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা, অন্ধকার স্থানে লাইটের ব্যবস্থা, একের পর এক সম্প্রীতি সমাবেশসহ পুলিশের নানা উদ্যোগে সাহস ফিরে পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। শনিবার সেখানকার সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমবেত হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্য ‘জালবাইচ’ উৎসবে। সব আতঙ্ক ছাপিয়ে মানুষ পুরনো সম্প্রীতিকে ফিরে পায় সেই আনন্দঘন পরিবেশে।
তবে ঘটনার ২৯ দিনেও নাসিরনগরে অপকান্ডের ইন্দনদাতা কিংবা মূল হোতারা গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সাধারণ মানুষকে। যদিও ঘটনার পর থেকেই পুলিশ ইন্দনদাতা চিহ্নিত বলে দাবি করে আসছিল।
তাছাড়া আলোচিত সেই ফেসবুক পোষ্ট কে দিয়েছিল? কারা চারদফা আগুনের ঘটনায় জড়িত ? কিংবা কোথায় আছে রসরাজের পরিবার এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরাই রয়ে গেছে। জবানবন্দিতে উঠে আসা এক জনপ্রতিনিধির মোবাইল চালু থাকলেও পুলিশ বলছে, একের পর এক অভিযানেও তাকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছেনা। এ ছাড়া কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ওই দিনের সমাবেশের আয়োজকদের বিরুদ্ধেও।
ধর্ম অবমাননার ওই পোষ্টটি কে দিয়েছে সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি মামলার তদন্তে নিয়োজিত ডিবি পুলিশ।
২৮ নভেম্বর দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা ডিবি’র ওসি মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘টার্গেটে থাকা কিছু আসামী গ্রেপ্তার হলে কাজটি সহজ হতো। আমরা বিষয়টি নিয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।’ তবে তদন্তে অগ্রগতি আছে বলে দাবি করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, রসরাজের পরিবার কোথায় আছে সেটি এখনো তারা জানেননা। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাজটি রসরাজ নিজে করেছিল কিনা সেটা আজকালের মধ্যেই পরিস্কার হতে পারে। ফরেনসিক রিপোর্টটি দুই একদিনের মধ্যেই জেলা পুলিশের কাছে আসার কথা। রিপোর্টটি হাতে আসলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার দুই সাক্ষীর জবানবন্দিতে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিসহ কয়েকজনের নাম উঠে আসে। সাক্ষী দুই ট্রাক চালক নুরুল হক ও পারভেজ খান আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আতিকুর রহমান আঁখি, জাহাঙ্গীর, রুবেল ও সৃজন নামে চারজন ট্রাক ভাড়া করে বলে উল্লেখ করেছেন। ১৩ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারা এ জবান বন্দি দেন।
এর মধ্যে হরিপুর এলাকার জাহাঙ্গীর আল-আমিন সাইবার পয়েন্ট ও স্টুডিও’র মালিক, রুবেল আতিকুর রহমানের ভাই। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর চেয়ারম্যানের লোক। তবে তাদের কেউ এখন পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি।
এদিকে ১০ সদস্যের একটি আইসিটি বিশেষজ্ঞ নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন। ওই দলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাজ করে গেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তারাও রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দলের একাধিক সদস্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে আগুন সন্ত্রাসীদের তারা চিহ্নিত করেছেন। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পরে আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িতদের তথ্য দিলে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা দেয় জেলা পুলিশ। সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, আগুনের ঘটনায় মৌলবাদী গোষ্টির বাইরে একটি গ্রুপ কাজ করছে বলে তারা মনে করেন। কিন্তু আজও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারিনি পুলিশ। গত ৩০ অক্টোবর হামলা, ভাঙচুরের পর মোট চার দফায় সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দুই দফায় আগুন দেওয়া হয় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন কুমার দেবের বাড়িতে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রশাসনের নানা উদ্যোগের কারণে পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তবে ঘটনার মূল হোতারা এখনো অধরায় থাকার বিষয়টি মানতে পারছে মানুষ।’ মূল নায়করা গ্রেপ্তার না হলে এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সহকারি পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আব্দুল করিম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তদন্তে নাসিরনগরের পুরো ঘটনায় আমরা মোস্ট ওয়ানটেড হিসেবে ৫ জনকে চিহ্নিত করেছি। তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে ইতিমধ্যে দেশের সকল স্থল ও বিমানবন্দরকে সতর্ক করা হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে সেখানকার অন্ধকার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে লাইট লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। এলাকাবাসীর মাধ্যমে আমরা গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সিসি ক্যামেরা ও লাইট লাগাচ্ছি। সেখানকার পরিস্থিতি এখন একেবারেই স্বাভাবিক বলে জানান তিনি। তবে মোস্ট ওয়ানটেড ৫ জনের মধ্যে কোন জনপ্রতিনিধি আছে কিনা জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন জানান, ওই দিনের ঘটনা ঘটাতে যারা ব্যাপক সহযোগিতা করেছিল তাদের মধ্যে হিরা মোল্লা, ডালিম এবং সুজন পাটোয়ারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সমাবেশে ট্রাক চালকরা আসতে না চাইলেও তারা নানাভাবে তাদের বাধ্য করেছিলেন। এ ঘটনায় তারাসহ মোট ৯৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জবানবন্দিতে নাম উঠে আসা হোতাদের নজরদারিতে রাখার বিষয়টি অনেক আগের কথা। এখন তারা পলাতক। আমরা তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছি।’ আগুনের ঘটনা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে জবানবন্দিতে নাম উঠে আসা হরিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আখিঁর একটি বাংলালিংক মোবাইল নম্বরে আজ দুপুরে কল দেওয়া হলে ফোন রিসিভকারি নিজেকে তার ছেলে তানসিব পরিচয় দেন। তিনি জানান, তার বাবা অসুস্থ। বর্তমানে ঢাকার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আজ তার একটি অপারেশন হবার কথা। তবে এব্যাপারে বিস্তারিত কিছু তিনি জানেন না বলে জানান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান তারা ঢাকার উত্তরায় একটি বাসায় থাকেন।
প্রসঙ্গত, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর জেলার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে তান্ডব চালানোর ঘটনা ঘটে।

