নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের (হকারদের) মহানগর নাট্যমঞ্চের খালি জায়গায় পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২ হাজার ৫০২ জন হকার নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, ডিসিসি দক্ষিণের পুনর্বাসন তালিকায় অনেক প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ও হকার-নেতাদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম দেওয়া হয়েছে।
এমনকি কয়েকজন প্রকৃত হকারের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, তারা বিষয়টি জানেনই না। অর্থাৎ তারা বঞ্চিতের কাতারে। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় প্রকৃত হকাররা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে বলে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
গুলিস্তান পাতাল মার্কেটের উত্তর পাশের গেটের সামনের হকার মো. মোমেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হকারদের তালিকা করতে অনেকের মতো আমার ছবি, ভোটার আইডি কার্ড নিয়েছিল। কিন্তু পরে তালিকায় (পুনর্বাসন তালিকা) আমাদের নাম আছে কি না, জানতে পারি নাই। আবার অনেকের কাছ থেকে কোনো ছবি, ভোটার আইডি কার্ডও নেয়নি।’
এর কারণ কী হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা (সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা) তালিকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও হকার নেতাদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম দিয়েছে শুনেছি।’
মো. মোমেন আরো বলেন, ‘গুলিস্তান, পল্টন ও বাইতুল মোকাররমের এলাকায় চার হাজারের বেশি হকার রয়েছে। কিন্তু তালিকা করা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ জনের। পরিস্কারভাবে কাজ করলেও তো সবার গতি (পুনর্বাসন) হবে না।’
পল্টনের হকার নুরে আলম বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালীদের তালিকা অনুযায়ী ডিসিসি দক্ষিণ হকারদের তালিকা করেছে। যারা বকশিস দিতে পারেনি, তাদের নাম উঠেনি। আর এ কারণে অনেক প্রকৃত হকাররা বাদ পড়েছে।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি ও ডিএসসিসির হকার পুনর্বাসন কমিটির সদস্য এম এ কাশেম বলেন, ‘মহানগর নাট্যমঞ্চের পাশে তিন দিকে তালিকাভুক্ত ২ হাজার ৫০২ জন হকারকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তালিকার সবাই হকার।’
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে গুলিস্তান এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদ করে মহানগর নাট্যমঞ্চের তিন দিকে হকারদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর মে মাসে হকার পুনর্বাসন কমিটি গঠন করে ডিসিসি দক্ষিণ। এ কমিটি ২ হাজার ৫০২ হকারকে তালিকাভুক্ত করে। মহানগর নাট্যমঞ্চের খালি জায়গায় পুনর্বাসনের জন্য ইতিমধ্যে ২ হাজার ৫০২ জন হকারের তালিকা করা হয়েছে। নাট্যমঞ্চের খালি জায়গায় টিনের শেড নির্মাণ করে তাদের পুনর্বাসন করা হবে। প্রত্যেক হকারকে ৪ বাই ৪ ফুট (১৬ বর্গফুট) জায়গা দেওয়া হবে। শিগগিরই তাদের (হকারদের) পুনর্বাসন করা হবে।
কিন্তু হকারদের পুনর্বাসন না করে গত ২৭ অক্টোবর হকার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে ডিসিসি দক্ষিণের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা চালায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারা (স্থানীয় প্রভাবশালীরা) হকারদের কাছ থেকে মাসোহারা নেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপরও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখে ডিসিসি। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ফুটপাতের দোকান। একদিন পার হতে না হতেই (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে আবারো ফুটপাত দখল হয়ে যায়। এদিকে গত ২৯ অক্টোবর ডিসিসি দক্ষিণের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও হকার পুনর্বাসন কমিটির নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন মেয়র সাঈদ খোকন। বৈঠকে গুলিস্তান, পল্টন ও বায়তুল মোকাররমের ২ হাজার ৫০২ হকারকে মহানগর নাট্যমঞ্চের খালি জায়গায় পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশ দেন মেয়র সাঈদ খোকন। প্রকৌশল বিভাগ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। শিগগিরই পুনর্বাসন কাজ শুরু হবে।
এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও হকার পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক খালিদ আহম্মেদ বলেন, ‘শুধু ফুটপাতে থাকা হকারদের তালিকা করেছি। রাস্তায় থাকাদের কোনো তালিকা করা হয়নি।’
এ বিষয়ে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও বায়তুল মোকাররমের হকারদের নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। সেই ডাটাবেজ অনুযায়ী মহানগর নাট্যমঞ্চের খালি জায়গায় প্রাথমিক অবস্থায় ২ হাজার ৫০০ হকারকে পুনর্বাসন করা হবে।’
উল্লেখ্য, রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে গুলিস্তান হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন। একাধিকবার উচ্ছেদ করলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়।

