অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : কর প্রদানে সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে উৎসাহিত করতে করদাতা ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীর পাশাপাশি যোগ করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, সাংবাদিক, মহিলা চাকুরিজীবী, ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, তরুণ করদাতা, খেলোয়াড়, অভিনয় ও কন্ঠশিল্পীসহ ১৮টি বিভাগ।
চলতি ২০১৬-২০১৭ করবর্ষ থেকেই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ থেকে বৃদ্ধি করে ১৪১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে এই ট্যাক্স কার্ড। আর এজন্য সংশোধন করা হয়েছে ট্যাক্স কার্ড নীতিমালা। যা জাতীয় ট্যাক্স কার্ড নীতিমালা-২০১০ (সংশোধিত) হিসেবে পরিচিত হবে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর-২ এর উপসচিব মো. জিল্লুর রহমানের সই করা প্রজ্ঞাপনে ব্যক্তি পর্যায়ে ৭৬ জন, কোম্পানি পর্যায়ে ৫৩টি এবং অন্যান্য পর্যায়ের ১২ জন করদাতাকে ট্যাক্স কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেন, ‘যারা উচ্চ পর্যায়ে কর দিচ্ছেন তাদের স্বীকৃতির বিষয়টি চিন্তা করে ট্যাক্স কার্ডের সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪১ করা হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ ধরনের উদ্যোগে ভালো সুফল পাওয়া গেছে। আশা করছি এতে যারা করযোগ্য আয় করছেন তারা উৎসাহিত হবেন।’
গত ৮ নভেম্বর জারি করা নতুন নীতিমালায় মোট ১০টি ধারা ও ৩৬টি উপধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি অর্থবছর আগের কর বছরে পরিশোধিত আয়করের ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি, কোম্পানি ও অন্যান্য করদাতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স কার্ডের জন্য মনোনীত হবে।
ট্যাক্স কার্ডের সংখ্যা ও বিভাজনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ট্যাক্স কার্ডের জন্য তিন ক্যাটাগরিতে করদাতা মনোনয়ন দেওয়া হবে। ক্যাটাগরিগুলো হলো- (ক) ব্যক্তি (খ) কোম্পানি ও (গ) অন্যান্য।
২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে ট্যাক্স কার্ডের মোট সংখ্যা হবে ১৪১। এদের মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে ৭৬টি, কোম্পানি পর্যায়ে ৫৩টি এবং অন্যান্য পর্যায়ে ১২টি কার্ড প্রদান করা হবে। আর এই সিদ্ধান্ত অন্তত তিন বছরের মধ্যে পরিবর্তন হবে না। যদিও পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এনবিআর ট্যাক্স কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারবে।
এর মধ্যে ব্যক্তি শ্রেণি করদাতার ট্যাক্স কার্ড দুই শ্রেণিতে মোট ১৮টি ক্যাটাগরিতে ৭৬ জন করদাতাকে দেওয়া হবে। তাদের মধ্যে বিশেষ শ্রেণিতে ৫ জন সিনিয়র সিটিজেন করাদাতা, ৫ জন গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা, ৩ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি করদাতা, ৫ জন মহিলা করদাতা ও ৫ জন তরুণ করাদাতাসহ (৪০ বছর বয়সের নীচে) মোট ২৩ জনকে নির্বাচন করা হবে।
অন্যদিকে ব্যক্তি পর্যায়ের আয়ের উৎস বা পেশা হিসেবে ৫ জন ব্যবসায়ী, ৫ জন বেতনভোগী, ৫ জন ডাক্তার, ৫ জন সাংবাদিক, ৫ জন আইনজীবী, ৩ জন প্রকৌশলী, ৩ জন স্থপতি, ৩ জন একাউন্ট্যান্ট, ৭ তরুণ করদাতা, ৩ জন খেলোয়াড়, ৩ জন অভিনেতা বা অভিনেত্রী, ৩ জন গায়ক ও গায়িকা, অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩ জনসহ মোট ৫৩ জন করদাতাকে ট্যাক্সকার্ডের জন্য নির্বাচন করা হবে।
কোম্পানি পর্যায়ের করদাতার ট্যাক্স কার্ড নির্বাচনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী খাত ভিত্তিতে মোট ১৪টি ক্যাটাগরিতে ৫৩টি কোম্পানি করদাতাকে ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং পর্যায়ে (তালিকাভুক্ত সকল ব্যাংক) ৪টি, অ-ব্যাংকিং আর্থিক খাতে (সকল লিজিং কোম্পানি ও মার্চেন্ট ব্যাংক) ৪টি, টেলিকমিউনিকেশন খাতে (মোবাইল ফোন অপারেটর) ১টি, প্রকৌশল খাতে (অটোমোবাইল ও ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রভৃতি) ৩টি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক ক্যাটাগরিতে (ডেইরি ফার্ম, বিস্কুট ও বেকারি পণ্য) ৩টি, জ্বালানি খাতে (অয়েল রিফাইনারি ও জ্বালানি তেল) ৩টি, পাট খাতে ৩টি, স্পিনিং ও টেক্সটাইল খাতে ৭টি, ঔষধ ও রসায়ন খাতে ৪টি, প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় ৪টি, রিয়েল এস্টেট খাতে ৩টি, তৈরি পোশাকে ৭টি, চামড়া শিল্পে ৩টি ও অন্যান্য খাতে ৪টিসহ মোট ৫৩টি ট্যাক্স কার্ড দেওয়া হবে।
অন্যান্য করদাতা বিভাগে চার ক্যাটাগরিতে ১২টি ট্যাক্স কার্ড দেওয়া করা হবে। ক্যটাগরিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্ম পর্যায়ে ৪টি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিভাগে ২টি, ব্যক্তি সংঘে ২টি ও অন্যান্য খাতে ৪টিসহ মোট ১২টি ট্যাক্স কার্ড।
মনোনয়নের যোগ্যতা ও শর্তের বিষয়ে নীতিমালার ৪ ধারায় বলা হয়েছে, পুরস্কারের মনোয়নের জন্য সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী করদাতাকে পূর্ববর্তী কমপক্ষে ৫ বছর নিয়মিত করদাতা হতে হবে। এ নীতিমালার অধীনে ট্যাক্স কার্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ‘জেলাভিত্তিক সর্বোচ্চ ও দীর্ঘসময় আয়কর প্রদানকারী করদাতাদের পুরস্কার প্রদান নীতিমালা ২০০৮’ অনুযায়ী এ পুরস্কারের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
প্রজ্ঞাপনের ধারা ৪ এর ৭ উপধারা অনুযায়ী আয়কর অধ্যাদেশের অধীন কোনো করদাতার আয়কর মামলা আপিলে বিচারাধীন থাকলে ৭৪ ধারায় পরিশোধকৃত আয়করের ভিত্তিতে মনোনয়ন পাবেন।
মনোনয়নের যোগ্যতার বিষয়ে আরো বলা হয়েছে, কোনো ক্যাটাগরিতে যোগ্য করদাতা না থাকলে অন্য ক্যাটাগরির সম্মিলিত তালিকা হতে ট্যাক্স কার্ডের জন্য মনোনয়ন করা হবে।
নতুন নীতিমালার ৫ নম্বর ধারায় মনোনয়নের অযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে, আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কর পরিশোধ ও আয়কর রিটার্ণ দাখিলে ব্যর্থ হলে, করদাতা যদি ঋণখেলাপি, আয়কর ও অন্যান্য কর বকেয়া, এনবিআরের আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট সংশ্লিষ্ট মামলা বিচারাধীন, আদালত থেকে সাজাপ্রাপ্ত অথবা অন্য কোনো কারণে অবাঞ্চিত ব্যক্তি মনোনয়নের যোগ্য হবেন না। তবে সাজা ভোগ করার ৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মনোনয়নের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
মনোনয়নের পদ্ধতির বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতি বছরের ১৫ মে’র মধ্যে কর কমিশনার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ট্যাক্স কার্ড পাওয়ার যোগ্য করদাতার প্রাথমিক তালিকা এনবিআরে প্রদান করবেন। প্রাথমিক তালিকা থেকে এনবিআরের কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সদস্যের নেতৃত্বে গঠিত ‘ট্যাক্স কার্ড মনোনয়ন কমিটি’ ট্যাক্স কার্ড মনোনয়ন দেবে।
ট্যাক্স কার্ডপ্রাপ্তদের পুরস্কার ও সুবিধার বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক করদাতাকে ট্যাক্স কার্ড এবং সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে। ট্যাক্স কার্ডপ্রাপ্তরা বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান এবং সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা, স্থানীয় সরকার কর্তৃক আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধর্ণা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাবেন।
আরো সুবিধার মধ্যে রয়েছে, যে কোন ভ্রমণে বিমান, রেলপথ ও জলপথে সরকারি যানবাহনে টিকেট প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার; ট্যাক্স কার্ডধারী, স্বামী বা স্ত্রী ও নির্ভরশীল পুত্র-কন্যার চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধা প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার; বিমানবন্দরে সিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার সুবিধা; তারকা হোটেলসহ সকল আবাসিক হোটেলে বুকিং প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার।
ট্যাক্স কার্ডধারীর কার্ডের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ হতে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। মেয়াদকাল উত্তীর্ণ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে কার্ড এনবিআরে জমা দিতে হবে। মেয়াদকাল উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ওই সব সুবিধা পাবেন না।
এর আগে গত ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় ট্যাক্স কার্ড নীতিমালা, ২০১০ (সংশোধিত) খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

