আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর। বর্তমান বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ারের প্রেসিডন্ট নির্বাচন। তাই পুরো বিশ্বের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে।
মার্কিন নির্বাচনের প্রধান দুই প্রার্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদের মধ্যে কে আগামী চার বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী বিশ্বের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনও।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে নবরূপ দান করবে। সেক্ষেত্রে সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পুলিশম্যান’ হিসেবে ভূমিকার কিছুটা পতন ঘটতে পারে। তাদের ভাষায় ট্রাম্প ‘হঠকারী ও অনির্দেশ্য’। তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন।
অন্যদিকে, হিলারি ক্লিনটনের জয় সিরিয়া ও ইউক্রেনে হোয়াইট হাউসের ‘বাজপাখি চোখ’কে আরো তীক্ষ্ণ করবে।
হিলারি নাকি ট্রাম্প, কাকে চায় বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলো। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
রাশিয়া : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুই দলের প্রার্থী নির্ধারিত হওয়ার পর থেকেই অভিযোগ ওঠে রাশিয়া নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটনের পরিবর্তে রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই চাইছে রাশিয়া, এমন গুঞ্জন ওঠে। এর পালে হাওয়া মেলে যখন মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে রাশিয়া সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে, এমন অভিযোগ ট্রাম্প বিবৃতি দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই একমাত্র নেতা যিনি প্রকাশ্যে চাইছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আসুক।
পুতিনের চোখে, রিপাবলিকানরা ‘রঙিন’। আর তার বিরুদ্ধে আমেরিকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য গোপন অভিযান পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
রাশিয়ায় ট্রাম্পের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে এবং বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি পুতিনের প্রশংসাও করেছেন।
এক নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বলেন, ‘যখন লোকজন আপনার প্রশংসা করে, সেটি সবসময়ই ভালো। বিশেষ করে সেই ব্যক্তি যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন।’
পুতিনও নানা সময়ে ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘ট্রাম্প অনেক সময় অতিরঞ্জিত আচরণ করেন, কারণ তিনি সাধারণ একজন আমেরিকানের মতোই।’
অন্যদিকে, হিলারির সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক অনেকটাই শীতল। ২০১১ সালে রাশিয়ার পার্লামেন্টারি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য পুতিন এখনো হিলারিকে ক্ষমা করতে পারেননি।
সাম্প্রতিক এক টেলিভিশন বক্তৃতায় হিলারি বলেছেন, ‘১৭টি গোয়েন্দা সংস্থা মার্কিন নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য গুপ্তচর ও সাইবার হামলা চালিয়েছে। আর এসব হয়েছে ক্রেমলিনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে।’
ট্রাম্প অবশ্য মার্কিন গোয়েন্দাদের এমন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চান।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে রাশিয়াবিরোধী বিশ্বজোটের মনে শঙ্কা ধরেছে যে, ট্রাম্প হয়ত রাশিয়ার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবেন এবং সিরিয়ায় পুতিনকে একচ্ছত্র প্রভাব খাটাতে দেবেন।
যুক্তরাজ্য : যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ইতিমধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে একবার বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।
ট্রাম্প যখন বলেছেন, মুসলিম লোকজনের দায়ে লন্ডনে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। তেরেসা মে এর প্রতিবাদ করে বলেছেন, ‘ট্রাম্প যুক্তরাজ্যকে পরিমাপ করতে পারেননি। তিনি পুরোপুরিই ভুল।’
যুক্তরাজ্য মনে করে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ট্রাম্পের চেয়ে হিলারি অনেক বেশি প্রতিশ্রুতিশীল এবং হিলারি ক্ষমতায় আসলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্ক বজায় থাকবে।
এদিকে, লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন চাটাম হাউস এর সহকারী প্রধান ড. জ্যাক প্যারাক্যালিস বলেছেন, ‘বৈশ্বিক সম্পর্ককে থোরাই কেয়ার করেন ট্রাম্প। তিনি আমেরিকার প্রচলিত মৈত্রীদের গণ্য করেন না। তিনি ইতিহাস নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নন। তিনি নতুন সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। এশিয়া, ইউরোপ, ল্যাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের সর্বত্র থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ লাভবান হওয়া যায়, সেটিকেই তিনি গুরুত্ব দেবেন।’
ইউরোপ : ইউরোপের খুব কম দেশই মনে করে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তাদের জন্য সুবিধাজনক হবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘ট্রাম্প চায় আপনার যেন বমির উদ্রেক হয়।’
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার শেনমেয়ার মুসলিমদের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মনোভাবের জন্য তাকে ‘ঘৃণা প্রচারক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আমদানির ওপর ট্রাম্পের অবরোধ ও ট্যারিফ আরোপের ট্রাম্পের প্রতিজ্ঞা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ‘ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ এর কবর রচিত হতে পারে বলে ইইউর শঙ্কা।
ইইউর আরো ভয় যে, ট্রাম্প ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে রাশিয়ার ওপর যৌথ পদক্ষেপকে ‘ধ্বংস’ এবং গোয়েন্দা তথ্যাদির অংশীদারিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারেন।
ন্যাটো : ট্রাম্প নির্বাচিত হলে ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রিটি তথা ন্যাটোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারেন। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় একাধিকবার বলেছেন, তিনি ন্যাটোর ব্যয়ের অধিকাংশ শেয়ার বহন করবেন না এবং ন্যাটোভুক্ত প্রত্যেক দেশকে সমান ব্যয় বহন করতে হবে।
ড. প্যারাক্যালিসের মতে, ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পেন্টাগন ও কংগ্রেস থেকে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হবেন। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পেন্টাগনকে তাই করতে হবে যা প্রেসিডেন্ট চাইবেন।’
ন্যাটোর প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমেরিকা যদি ন্যাটো থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়, এটি বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার পেশি আরো শক্ত হবে।’
তার মতে, ট্রাম্পের বিবৃতি আন্তর্জাতিক আইনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ‘স্বৈরশাসক, সন্ত্রাসী ও দুষ্ট রাষ্ট্রগুলোর’ প্রতি আমন্ত্রণপত্র।
মধ্যপ্রাচ্য : ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিপ্রক্রিয়া, সিরিয়া পরিস্থিতি ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবকিছুই মার্কিন নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে বারাক ওবামার চুক্তিকে (যার মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি পেয়েছিল) ট্রাম্প বাতিল করার শপথ নিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে জঙ্গি সংগঠন আইএসকে দমন করতে ইরাক ও সিরিয়ায় ৩০ হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব আরব দেশগুলোকে হতাশ করেছে। তবে ইসরাইল এ ব্যাপারে খুব খুশি। তাই ট্রাম্পকেই তারা বেশি করে চাচ্ছে। তবে হিলারি হলেও তারা যে খুব হতাশ হবে, তা নয়।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিলারি প্রেসিডেন্ট হলেও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নানা নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি সিরিয়ায় আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। ইতিমধ্যে তিনি আলেপ্পোকে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণার ব্যাপারে মত দিয়েছেন, যেটি রাশিয়া একেবারেই ভালোভাবে নেয়নি।
ট্রাম্পের মতে, এর মাধ্যমে হিলারি ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বাঁধানোর পথে এগুচ্ছেন।
চীন ও ভারত : বারাক ওবামার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মনোযোগ ইউরোপ থেকে সরিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বেশি স্থাপন করে। হিরারিও একই রকম নীতি চালিয়ে যাবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতেই তিনি আগ্রহী।
অন্যদিকে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি চুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চুক্তিতে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন চীনের বিরুদ্ধে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লু জিওয়ে ট্রাম্পকে ‘বিবেচনাহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে যদি বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বনেতৃত্ব হারাতে পারে।’
তা ছাড়া, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বড় দুটি দূষণকারী দেশ। সেক্ষেত্রে তারা যদি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আলোচনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেটি বিশ্বের জন্য অমঙ্গলজনকই হবে।

