নিজস্ব প্রতিবেদক : এক সময় সব ছিল। নিজের ভিটে। সেখানে একটা ছোট্ট ঘর। কাজকর্মে বেশ ভালোই চলত সংসার। বাড়ির আঙিনায় ছিল সবজি বাগান। সেখান থেকে আসতো বাড়তি আয়। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতো। কিন্তু এখন কিছুই নেই। ভিটেহারা, বাড়িহারা, কাজহারা। এক বছরে পাঁচবার বাড়ি বদল করে শুধু পিছু হটেছে। এখন দেয়ালে ঠেকেছে পিঠ। নিজেরটা তো শেষই, বাপদাদার ভিটে আঁকড়ে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। সারাজীবনের সঞ্চিত সম্পদ গিলে খেয়েছে মেঘনা।
ভোলা সদরের ইলিশায় মেঘনাতীরের জেসমিন বেগমের জীবন এভাবেই ওলটপালট হয়ে গেছে। সব হারিয়ে এখন পথেই জীবন। স্বামী দুলাল মিয়া রিক্সা চালিয়ে আগে যে রোজগার করতেন, এখন সে রোজগার নেই। খরচ পোষাতে স্কুল পড়ুয়া এক ছেলেকে চা-দোকানে কাজে পাঠিয়েছেন। এলাকায় তেমন কাজ না থাকায় দুলাল মিয়া নিজেও বিভিন্ন শহরে কাজে যান। কিন্তু এভাবে সাতজনের সংসার চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে নিঃস্ব হওয়া এই পরিবারটির পুরনো ঠিকানা ছিল ভোলা সদরের ইলিশা ইউনিয়নের পুরাতন গাজীপুর গ্রামে। মেঘনার ভাঙ্গনের সাথে সাথে সেখান থেকে কয়েকবার বাড়ি বদল করতে হয়েছে। এদের শেষ ঠিকানা ছিল এই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের জংশন গ্রামে। বিগত ১৫ বছরে এই পরিবারটি ৭বার বাড়ি বদল করেছে। বাড়ি বদলের সঙ্গে সঙ্গে হারাচ্ছে সম্পদ, বাড়ছে দেনার পরিমাণ, একই সঙ্গে সংসারের বোঝাও ভাড়ি হয়ে উঠছে। দুর্যোগে জীবন ওলটপালট করে দিলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কিংবা পূনর্বাসনের জন্য এই পরিবারের জন্য বিশেষ কিছুই মেলেনি।
জেসমিন জানালেন, সরকারি-বেসরকারি বিশেষ কোনো সহায়তা তার ভাগ্যে জোটেনি। গত বর্ষায় নদী-ভাঙ্গনের পর এলাকার বেশ কিছু পরিবার ৫ হাজার করে টাকা অর্থ সহায়তা পেলেও এদের নাম ওঠেনি সে সাহায্যের তালিকায়। স্বামীর দৈনিক রোজগার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আগে রিকশা চালিয়ে যেখানে ৫০০ টাকা পেতেন সেখানে এখন মাত্র ১৫০-২০০ টাকা মেলে। জীবন যাপনে কষ্টের কথা বলতে গিয়ে জেসমিন বললেন, ‘আল্লাহ, এত কষ্ট না দিয়া আমাগো সবারে একসাথে লইয়া যাও।’
আলাপে জানা গেল, একমাত্র দুর্যোগের কারণেই এই পরিবারটি একেবারেই পথে বসে গেছে। জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানি বৃদ্ধিসহ ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিবারটির পক্ষে আর মেঘনার তীরে বসবাস করা সম্ভব হয়নি। স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে সন্তানদের মানুষ করার ইচ্ছা থাকলেও তা হয়নি। বড় ছেলে সিরাজকে (১৫) স্কুলে পাঠালেও তার স্কুলে যাওয়া এখন বন্ধ। অন্য সন্তানদের মধ্যে হোসেন (১২), হাসান (৯), স্বপ্ন (৪), মমিন (৩) মায়ের সাথে ঘরেই থাকে। ওদের ভাবিষ্যত কী হবে, তা বাবা-মায়ের জানা নেই। এক অনিশ্চিত আগামীর পথে এই শিশুরা হাজারো পরিবর্তনের ভেতরে বেড়ে উঠছে।
মেঘনার তীরে প্রতিনিয়ত দুর্যোগের আতংকে সময় অতিবাহিত করছে এই পরিবার। ঘূর্ণিঝড়ের খবর পান রেডিও-টেলিভিশন থেকে। নদীতীরের বড় স্থাপনাগুলো একে একে বিলীন হয়ে যাওয়ায় আশ্রয়ের স্থানও কমে যাচ্ছে। ঝড়ের সময় এরা অধিকাংশ সময়ই নিজের ঘরে থাকেন। ঝড়ের খবর পেলে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এরা বেঁচে থাকে নিয়তির ওপর ভর করে।
এই পরিবারটির নিজের ঘরে বসবাসের স্মৃতি প্রায় ঝাপসা হতে চলেছে। কখনো রাস্তার পাশে ডেরা বানিয়ে, কখনো কারো ঘরের সাথে বারান্দা বানিয়ে, আবার কখনো বা স্কুল ঘরের বারান্দায় এদের বসবাস। শেষ ঠিকানা কোথায়, তা জানা নেই এদের। ঘরে দুটো সিলভারের কলসি, দুটো ভাতের গামলা, দুটো পাতিল, ৪টি প্লেট, একটি জগ, কিছু কাঁথা-বালিশ। গোটা ঘরের মালামালের দাম হিসেব করলে দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা। এর ওপর এই পরিবারটির ওপর রয়েছে ২০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা। জেসমিনের স্বামী দুলাল মিয়া অটোরিকশা কেনার জন্য এই ঋণ এনেছিলেন। তা এখনও শোধ হয়নি। রোজগারের যে অবস্থা, তাতে এই ঋণ কবে শোধ করা সম্ভব হবে, তা জানা নেই জেসমিনের।
দুর্যোগের সঙ্গে বসতি, তাই রোজগারে ভাটা, আর সে কারণে তিনবেলা খাবার যোগাড়ও এই পরিবারের জন্য বেশ কষ্টকর। দৈনিক ২ থেকে আড়াই কেজি চাল সংগ্রহ করা এই পরিবারের জন্য কঠিন। তাই কখনও আধপেটা খেয়েই দিন কেটে যায়। ভাতের সাথে ডিমভাজাই যেন এদের কাছে অনেক ভারি খাবার। সাধারণত, ডাল-মরিচ দিয়েই ভাত খেতে হয়। কখনো কখনো বড়রা সকালে না খেয়েই কাটিয়ে দেন।
একদিকে থাকার কষ্ট, অন্যদিকে কাজের অভাব। এর ওপর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ভয়, আর অসুখ-বিসুখের আক্রমণ। মেঘনাতীরের ইলিশায় এভাবেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে জেসমিনের মত পরিবারগুলোকে। সর্দি-কাশিসহ পানিবাহিত রোগ লেগেই থাকে। বেশিরভাগ বাচ্চারা ভোগে নিউমোনিয়া, জ্বর, পেট খারাপসহ বিভিন্ন অসুখে। রোগবালাই লেগে থাকলেও ওষুধ মেলে না। বিশেষ প্রয়োজনে জেসমিনসহ আশপাশের লোকজন শহরে সরকারি হাসপাতালে যায়, সামান্য অসুখ তাদের গা সওয়া।
বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে গেছে। ফলে জেসমিনের মত বহু পরিবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটছেন। এক সময় এলাকায় থাকতে না পেরে অবশেষে শহরের বস্তিতে মাথা গোঁজে। এরই মধ্যে উপকূলবর্তী এলাকা থেকে বহু মানুষ রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ বড় শহরগুলোর বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। জেসমিনের পরিবারের শেষ পরিণতিও হয়তো সেটাই!

