অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন বা তিন হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থিতিশীল ধারা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত ২৭ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। তখন ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পর তা কমে যায়। সম্প্রতি তা আবার ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রতিমাসে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ব্যয় হিসাবে হাতে থাকা এই রিজার্ভ দিয়ে আট মাসের আমদানি দায় পরিশোধ করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যাংকের রিজার্ভ ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২৭ জুন প্রথমবারের মতো ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। তখন থেকে প্রায় দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার বেশি রিজার্ভ এখন।
চলতি বছরে রিজার্ভের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলেছে। এপ্রিলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২৯ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে প্রথমবারের মতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈচৈয়ের মধ্যে এর আগে গত ২৫ এপ্রিল ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। তার আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এক বছর আগে গত বছরের জুন শেষে রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। গত এক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে। রিজার্ভের দিক দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির রিজার্ভের পরিমাণ ৩২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, সময়োপযোগী বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ ব্যবস্থাপনার কারণে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যের দাম কম থাকায় পরিমাণের দিক দিয়ে আমদানি বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার তুলনামূলক ব্যয় কম হচ্ছে।
তিনি বলেন, জুনের তুলনায় জুলাই মাসে রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। কিন্তু রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি আছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নতুন এ মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা জানান, সরবরাহ অনুযায়ী বাজারে ডলারের চাহিদা না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। চলতি অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩২০ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। আগের অর্থবছরের পুরো সময়ে কেনা হয় ৩৪০ কোটি ডলার। মূলত আমদানি ব্যয় কম থাকায় বাজারে উদ্বৃত্ত হওয়া ডলার কিনতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি ঋণ নিয়ে আমদানি ব্যয় মেটাচ্ছেন। সব মিলিয়ে সামনের দিনে আরো ডলার কিনতে হতে পারে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো বাড়বে।
গত ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির পর বিষয়টি নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা সারা বিশ্বের ব্যাংক খাতকে নাড়া দিয়েছে। চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার ফেরত এলেও ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফেরত আসেনি।
তবে সম্প্রতি ফিলিপাইন সরকার বলেছে, রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া সকল অর্থ ফেরত পাবে বাংলাদেশ। যদিও এই অর্থ ফেরত না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে এটিকে ‘অন্য সম্পদ’ হিসেবে দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রিজার্ভে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিবাচক প্রচারণায় হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে টাকা আসা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসায় এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে পড়েছে। এতে রিজার্ভ একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

