ভোলা প্রতিনিধি : মানুষগুলো ছুঁটছে। আজ এখানে, কাল সেখানে। বসতি ক্ষণিকের। দুই-তিনদিনের জন্য ঘর বাঁধা, আবার উঁচু স্থানের খোঁজ। সপ্তাহকালও স্থায়ী হচ্ছে না কোন বসতি। আতংক, উৎকণ্ঠায় সময় পার। রোজগারে ভাটা। কাজের সুযোগ নেই বললেই চলে।
পুরানো বাড়ির সান বাঁধানো পুকুর, প্রিয়জনের কবরস্থান, শখের বাগান, যত্নে গড়া থাকার ঘর, ফসলি মাঠ, কলেজ-স্কুল-মাদ্রাসা, সবই গিলছে মেঘনা। যেন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। এর মধ্যেই বহু মানুষের অতি কষ্টে সময় পার করতে হচ্ছে।
ভোলা সদরের মেঘনাতীরের ইলিশা-রাজাপুর এলাকার চিত্রটা এমনই। ভোলা জেলাসদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ঐতিহ্যবাহী ইলিশায় এখন আর জমজমাট বাণিজ্য নেই। মেঘনায় পাওয়া ইলিশের সেই তাজা গন্ধটা যেন এখন বাতাসে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। অথচ মাছঘাট ছিল এখানকার বাণিজ্যের প্রাণ। ইলিশের বাজার এখানকার বহু মানুষের কাজের সুযোগ করে দিত। কিন্তু সেসব এখন অতীত হতে চলেছে। মহাজনের গদি থেকে মজুরি নিয়ে চাল কিনে ঘরে ফিরতেন যে মজুর, তার দিন এখন বড়ই কষ্টের।
সরেজমিনে মেঘনার তীর ঘুরে চোখে পড়ে বিপন্নতার চিত্র। বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা চললেও তাতে কোন কাজই হচ্ছে না। দিনে দুবারের জোয়ারের পানিতে ডুবে যাচ্ছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট। ঠিক রাস্তা এখন আর নেই, বলা যায় কোনমতে হাঁটার পথ। এই পথটুকুও আর অবশিষ্ট থাকছে না। প্রতিদিনই বহু মানুষ বাড়ির আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন অন্যত্র। ঘরের চালা-বেড়া, হাড়ি-পাতিল-বাসন নিয়ে ছুঁটছে নারী-পুরুষ ও শিশুরা। বাঁধের ধারে কিংবা কোন বাড়ির উঠোনে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে সব আসবাব। কিন্তু কবে আবার এগুলো ঘরের রূপ পাবে, কেউ জানে না।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, মেঘনা তীরের ইলিশা আর রাজাপুর ইউনিয়নের বহুমানুষ অন্যত্র চলে গেছেন। কাজের অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। কলেজ-স্কুল-মাদ্রাসার বহু ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ। তারা ছুটাছুটির মধ্যে রয়েছে। রাতে ঘরের ভেতরে জোয়ারের পানি ঢুকলে সবাই মিলে বাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়। যেখানে তিনবেলা খাবার যোগাড়েই কষ্ট সেখানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কোন সুযোগ নেই। স্কুল ছাত্রদের অনেকে আবার জীবিকার প্রয়োজনে মজুরের কাজ খুঁজে নিয়েছে। ক’দিন আগে যে শিশু হাতে বই নিয়ে স্কুলে যেতো, এখন তার জায়গা হয়েছে চা দোকানে।
মেঘনা তীরে হেঁটে নজরে আসে, বহু শূন্য ভিটে পড়ে আছে। অতি যত্নে সাজানো গোছানো প্রিয়জনের কবরস্থান ভেঙে যাচ্ছে। স্কুলের সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে থাকলেও স্কুলঘর নেই। যে পথে মানুষ রিকশা-ভ্যানে যাতায়াত করতেন, সে পথ এখন এতটাই দুর্গম, হাঁটাই কষ্টকর। কিছু মানুষ এখন সেসব স্থানে যাতায়াত করছেন, কারণ বাড়িঘরের মালামাল সরাতে হচ্ছে, যতটা সম্ভব গাছ কেটে আনতে হচ্ছে। কিন্তু অতি শখের রঙ করা থাকার ঘরটা সেখানেই পড়ে থাকছে।
একজন রহমত আলী। সত্তর বছরের বেশি বয়স। মেঘনা তীরের রাজাপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাড়ি থেকে কিছু মালামাল নিয়ে যাচ্ছিলেন বাজারের দিকে। নদী থেকে খানিক দূরে বাড়ি বদল করা হয়েছে। সেখানেই যাবেন। ৫ ছেলে আর ২ মেয়ের বাবা তিনি। জীবনে আরও কয়েকবার বাড়ি বদল করেছেন। এখন তিনি একেবারেই ক্লান্ত। বললেন, ‘মেঘনা আমাদের জীবন ওলটপালট করে দিল। কোথায় যাব? কোথায় থাকব? জানি না।’
একই এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেনের থাকার স্থান এখন নৌকায়। বয়সে যুবক। বয়স কতইবা, মাত্র ৩৫। পরিজন পাঠিয়েছেন দূরে একটি স্থানে। নিজে নৌকায় থাকেন আর মাছ ধরেন। নিজের খরচ শেষে অবশিষ্ট কিছু বাড়ি পাঠান। কথা বলার সময় মেঘনার বুকে তর্জনী তুলে নিজের বাড়ির সীমানা আঁকার চেষ্টা করলেন। যেখানে তার বাড়ি ছিল, সেখানে এখন মেঘনার উত্তাল ঢেউ। একই অবস্থা পাশে দাঁড়ানো মো. ইউসুফ, আইউব আলীসহ আরও অনেকের। জীবিকার অবলম্বনের সঙ্গে মাথা গোঁজার ঠাঁইটাও তাদের জন্য এখন অনিবার্য।
ভোলা ফেরিঘাট ও ইলিশা বাঁচাও সংগ্রাম কমিটির সূত্র বলছে, এই এলাকার দুই ইউনিয়ন ইলিশা আর রাজাপুর মেঘনার ভাঙ্গনে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত বর্ষা থেকে এ পর্যন্ত রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামটি পুরোটাই বিলীন হয়ে গেছে। এই গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মধ্যে সামান্য সংখ্যক এখানে কোনমতে থাকার চেষ্টা করছেন। বাকিরা ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। এই ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার একরের মত ফসলি জমি মেঘনায় বিলীন হয়েছে। এখানকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রায় আট কিলোমিটার পাকা রাস্তা মেঘনায় ডুবেছে।
ইলিশা ইউনিয়নের উত্তর ইলিশা গ্রামের প্রায় অর্ধেক বিলীন হয়ে গেছে। মুরাদ ছবুল্লা গ্রামের পুরোটা বিলীন হয়েছে। কালুপুর গ্রামের তিনের দুই অংশ হারিয়ে গেছে। ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড পুরোটাই বিলীন হয়ে গেছে। ইউনিয়নের ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় হারিয়ে গেছে। একটি মডেল ডিগ্রী মাদ্রাসা হুমকির মুখে রয়েছে। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি ক্যাডেট মাদ্রাসা, একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙ্গনের কারণে বন্ধ রয়েছে। রাজাপুর ও ইলিশা ইউনিয়নে কলেজ-স্কুল ও মাদ্রাসার অন্তত ৩ হাজার শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বিভিন্নভাবে বিঘিœত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ভাঙ্গনে সব হারানো মানুষদের একটি অংশের ঠাঁই মিলেছে স্থানীয় আশ্রয় কেন্দ্রে। ইলিশায় তিনতলা স্কুল ভবনে খোলা আশ্রয় কেন্দ্রে গেলে বিপন্ন মানুষের কষ্ট সহজেই অনুমান করা যায়। এক সময় হয়তো সবই ছিল এদের; কিন্তু এখন আশ্রয় হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। স্কুলের মেঝেতে বিছানা। পাশে রান্নার চুলা। এখানে গিয়ে কষ্টে থাকা মানুষগুলোর কথা শুনতে চাইলে, সেগুলো নিয়ে লেখার কথা বললে, ছুটে আসেন বহু নারী-পুরুষ ও শিশু। নোটবুকে নাম লেখানোটাই দাবি তাদের। আলাপে জানা গেল, আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় আড়াইশ সব হারানো পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এদের অনেকেরই কাজকর্ম নেই।
আশ্রয়কেন্দ্রের একজন বাসিন্দা মোতাহার হোসেন। কালিপুর আদর্শ গ্রামে তার বসতি ছিল। সেখান থেকে বেশ কয়েকবার স্থান বদল করে অবশেষে এখানে ঠাঁই মিলেছে। এরপরের স্থান তার জানা নেই। আরেকজন খাদিজা বেগম, স্বামী ফরিদ উদ্দিন। বাড়ি এখন মেঘনার বুকে। আরেকজন তোফাজ্জেল হোসেন। রিকশার মেকানিকের কাজ করতেন। এখন কাজ নেই। আরেক জন জাহানারা বেগম। স্বামী সাহাবুদ্দিন। খাবারের দাবির সঙ্গে এদের মাথা গোঁজার দাবিটাও জোরালো।
ভোলা ফেরিঘাট ও ইলিশা বাঁচাও সংগ্রাম কমিটির সদস্য মো. নিজামউদ্দিন, নিজামউদ্দিন হাজী ও সাহাবুদ্দিন ফরাজীর সঙ্গে আলাপ হলো। তারা বললেন, চ্যানেল ছোট হয়ে যাওয়ায় নদী গতিপথ বদলেছে। এ কারণে ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়েছে। নদীর মাঝখানে যে চর পড়েছে, তা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে।
তারা জানান, এই এলাকার ভাঙ্গন রোধে সিসি ব্লক ফেলার জন্য ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০ কোটি টাকার কাজ বর্ষার পরে শুরু হবে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত জিওব্যাগ (বালুভর্তি বস্তা) ফেলে ভাঙ্গন রোধের কাজ অব্যাহত না রাখলে সবই বিফলে যাবে।

