
র্যাব প্রকাশিত তালিকার কয়েকজন
নিজস্ব প্রতিবেদক : গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় ঘরছাড়া তরুণদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর দেশে স্বেচ্ছায় নিখোঁজদের তালিকা তৈরি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে পুলিশ ধারণা করছে, এই তালিকার নিখোঁজরা একের অন্যের পরিচিত, এমনকি এরা একে অপরকে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে থাকতে পারেন।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে স্বেচ্ছা নিখোঁজ তরুণদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলার পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব থানাকে জরুরি ভিত্তিতে নিখোঁজদের তালিকা প্রস্তুত করতে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়। থানাগুলোও সেই নির্দেশনা মোতাবেক নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠায়। একই সঙ্গে কিছু নোটও দেয়।
থানা থেকে প্রাপ্ত নোটের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর ধারণা করছে, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি হামলার ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা মিলছে তারা একে অপরের পরিচিত। আগে থেকেই তারা একজন আরেকজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখত। একজনকে আরেকজন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ফেলেছে। কেউ কেউ আবার আত্মীয়তার সূত্রে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়েছে।
প্রমাণ হিসেবে অতীতের কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলশান হামলার পর যৌথবাহিনীর অভিযানে নিহত মীর সামিহ মুবাশশির ও নিখোঁজ জঙ্গি ইব্রাহিম হাসান খান আর জুনায়েদ খান সম্পর্কে খালাতো ভাই। ইব্রাহিম ও জুনায়েদ আপন ভাই।
এদিকে গুলশানে জঙ্গি হামলার পর যৌথ অভিযানে নিহত নিবরাস ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাওসীফ হোসেনও নিখোঁজ। চলতি বছর ৩ ফেব্রুয়ারি তাওসীফ ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হন। এরপর আর বাসায় ফেরেননি। তাওসীফ ও নিবরাস এক সঙ্গেই মালয়েশিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন।
পুলিশের ধারণা, নিবরাসের মতো তাওসীফও উগ্রপন্থায় জড়িয়েছেন। হঠাৎ তার রহস্যজনক নিখোঁজের বিষয়টি এই ইঙ্গিতই করছে। গত বছর ৩ নভেম্বর মালয়েশিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটি থেকে দেশে ফিরে আসেন তাওসীফ হোসেন। দেশে ফিরে কয়েকবার নিবরাসের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করেন।
৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কথা বলে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হন তাওসীফ। সঙ্গে নেন পাসপোর্ট। পরবর্তী সময়ে তাওসীফের বাবা ডা. আজমল হোসেন নিবরাসের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন নিবরাসও পাসপোর্ট নিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ।
এ ঘটনা জানার পর দুই পরিবারই তাদের খোঁজ করে। গুলশানের ঘটনায় নিবরাস নিহত হয়। কিন্তু বুধবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বেলা ৩টা) তাওসীফের কোনো হদিস মেলাতে পারেনি পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাওসীফ নিখোঁজের বিষয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি পরিবারের পক্ষ থেকে ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
এদিকে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রোকনুদ্দিনসহ ওই পরিবারের যে পাঁচ জন রহস্যজনকভাবে দেশ ছেড়ে চলে গেছে, তাদের প্রথম গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। গত বছর ১০ জুলাই তারা ঢাকা থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশ তার কিছু প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু ইস্তাম্বুল থেকে তারা কোথায় গেছে এ তথ্য জানে না বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দারা।
নিখোঁজদের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘পুলিশের সব সেক্টর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা করা হচ্ছে। কারা কী কারণে নিখোঁজ হয়েছে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব তথ্য মিলিয়ে একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘একেকজন একেক কারণে নিখোঁজ হতে পারে। নিখোঁজ সবাই জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে কিনা সেটা যাচাই না করে বলা যাবে না। নিখোঁজদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তারা কেন নিখোঁজ হলো তাও যাচাই করা হচ্ছে।’
এদিকে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে নিখোঁজ ২৬১ জনের একটি তালিকা র্যাবের মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকার মধ্যে ১২৬ জন নিখোঁজ হয়েছেন চলতি বছরে। অন্যরা নিখোঁজ হয়েছে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে।
নিখোঁজদের বিষয়ে কথা হলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতী মাহমুদ খানা বলেন, ‘নিখোঁজদের সন্ধানের প্রথম ধাপ এই তালিকা প্রনয়োন। এখন তালিকা ধরে একে একে সকলের খোঁজ করা হবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই আমাদের সবগুলো ক্যাম্পে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপশি গোয়েন্দা ইউনিটও কাজ শুরু করেছে।’

