নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘সাদামাটা মোড়ক (প্লেইন প্যাকেজিং)-তামাক নিয়ন্ত্রণে আগামী দিন’ প্রতিপাদ্যে আজ (মঙ্গলবার) সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে তামাক মুক্ত দিবস। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিবছর ৩১ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এর সহযোগী সংস্থাসমূহের উদ্যোগে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকিসমূহ তুলে ধরে তামাক ব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।
দেশের তামাক কোম্পানিগুলো প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। এমন কি তামাক কোম্পানিগুলোর সামনে প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও অসহায় বলে অভিযোগ তামাক বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতাদের।
এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘সরকারই যখন তামাক উৎপাদনকারী সবচেয়ে বড় কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিক্যান টোবাকোর (বিএটি) ১৩ শতাংশের অংশীদার তখন কোনোভাবেই তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, বিএটিএ বোর্ড পরিচালকদের আসনেও আছেন আমাদের দেশের মন্ত্রী-সচিবরা।’
তাই তামাক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে হলে প্রথমেই বিএটি’র অংশীদারিত্ব থেকে বের হয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন সাবেক এ বিসিবি সভাপতি।
সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০১৩’ প্রণয়ণ করে। কিন্তু অজানা প্রভাবে আইনটি কার্যকর করতে ২০১৫ সালে বিধিও প্রণয়ণ করা হয়। অবশেষে চলতি বছরের ১৯ মার্চ থেকে দেশে তামাকের মোড়ক আইন বাস্তবায়ন শুরু হয়। তাও আবার কোম্পানির ইচ্ছামতো। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সিগারেটের মোড়কের পার্শ্বদেশেই কোম্পানির ব্যান্ডরোল লাগানো থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংগঠন বিসিএমএ তামাকজাত দ্রব্যোর মোড়কের নিচের ৫০ ভাগ অংশে সচিত্র এ সতর্কবাণী মুদ্রণ করছে। যাদের পক্ষ নিয়েছে খোদ আইনমন্ত্রী। এক্ষেত্রে তামাক বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে ছবিসহ ৯টি সতর্কবাণী নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত তামাকের মোড়কে মুদ্রিত হচ্ছে মাত্র একটি ছবি যা তুলনামূলক কম বিভৎস।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের অভিযোগ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আপত্তিতেই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেছেন, ‘আমি তামাকের মোড়ক আইন সংক্রান্ত ফাইলটি সই করে আইনমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে জানিয়েছেন, কোর্টের নির্দেশনা আছে, সুতরাং এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’
রোববার (২৯ মে) সিরডাপ মিলনায়তনে তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন নাসিম।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বিধি অনুযায়ী তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের উপরিভাগের ৫০ শতাংশে সতর্কবাণী মুদ্রণের বিষয়ে আমার সম্মতি আছে। কিন্তু আইনমন্ত্রীর আপত্তিতেই আইনটির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
কারণ তামাক কোম্পানির দাবি অনুযায়ী তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের নিচের অংশের ৫০ শতাংশ জায়গায় ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে একটু কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এবং জুনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো থেকে প্রতিবছর সরকারের যে রাজস্ব আদায় হচ্ছে, পরোক্ষভাবে তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত লোকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য। তামাক সেবনের কারণে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জিডিপিতেও।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সিগারেট থেকে ৯ হাজার ৯৩০ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৩০ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় সিগারেট থেকে ১২ হাজার ২৬৭ দশমিক শূন্য ৩ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৭৭ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। তামাক খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেয়া বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তারা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে রাজস্ব দিয়েছে ৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তারা রাজস্ব দেয় ১১ হাজার ৫১ কোটি টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের আইএইচএমইর ২০১৩ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৯৫ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও কয়েক লাখ।
এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালে করা এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত নানা ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, যক্ষ্মা, প্যারালাইসিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টসহ প্রধান আটটি রোগে আক্রান্ত হয়। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা, অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্বের কারণে বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তামাক ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নিট ক্ষতির পরিমাণ ওই সময় অনুযায়ী ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতিবছর সিগারেট ক্রয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ও বিড়ি ক্রয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে।
এদিকে তামাক ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর একই হারে উচ্চ মাত্রায় কর আরোপের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

