নিউজ ডেস্ক : রমজান মাস শুরু হতে আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। রমজান মাসকে সামনে রেখে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিশেষ করে ইফতারিতে যেসমস্ত খাদ্যপণ্য বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর উৎপাদন, আমদানি, মজুতকরণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চলছে।
কিছু অসাধু লোক অধিক মুনাফার লোভে এসব খাদপণ্যে ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভেজালের মিশ্রণ করে থাকে। যা আমাদেরকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং আগামী প্রজন্ম বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বড় হচ্ছে।
শনিবার (১৪ মে) সকালে শাহবাগের চারুকলা অনুষদের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ বর্ণনা করেন বক্তারা। এ সঙ্কট থেকে উত্তোরণে সংশ্লিষ্ট সকলের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিও জানানো হয়। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), পল্লীমা গ্রিন, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম(নাসফ), বারসিক, জনউদ্যোগ, গ্রীন মাইন্ড সোসাইটি , মর্ডান ক্লাব, পুরান ঢাকা নাগরিক উদ্যোগ এবং পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধন আয়োজন করা হয়।
বক্তারা বলেন- রমজানের বাজার ধরার লক্ষ্যে এসব খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও মজুত করতে বিষাক্ত কেমিক্যাল, আর্টিফিশিয়াল হরমোন গ্রোথ, ফরমালিন ও মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর রেল ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, মোটর যান, নৌ যান ও কলকারখানার পোড়া তেল ও মবিল মিশ্রিত তেল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ইফতার সামগ্রী ভাজা হয়। এছাড়াও একই তেল বার বার ব্যবহার করার ফলে তা বিষাক্ত হয়ে যায়।
রাসায়নিক রঙ ও বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে ভোজ্য তেল তৈরি করা হয়। সেমাইয়ের ব্যাপক চাহিদা থাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদন এবং তাতে রাসাযনিক দ্রব্য মিশানো হচ্ছে। বিষাক্ত রং ব্যবহার করে সাদা ডিম লাল করা হয়। খেজুরে মিশানো হচ্ছে ফরমালিন। এছাড়াও পচা-বাসীসহ বিভিন্নভাবে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যের ব্যাপকতা বেড়ে যায়।
নানা ধরনের বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুতকৃত নিম্নমানের খাদ্যের কারণে আগামী প্রজন্ম বিভিন্ন গুরুতর অসুখের ঝুঁকি নিয়ে বড় হচ্ছে। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। গর্ভবতী মহিলারা জন্ম দিতে পারে বিকলাঙ্গ শিশু, গর্ভস্থ শিশু প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এসব খাবার খাওয়ার ফলে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে ক্যান্সার জাতীয় রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু খাবার এমনই বিষাক্ত যে তা ডিএনএকে পর্যন্ত বদলে দিতে পারে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই কিডনী রোগ হচ্ছে। প্রতিমাসে ক্যান্সার, কিডনী ও লিভার রোগী দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। দীর্ঘদিন বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মা ও তার পেটের ভ্রুনের ক্ষতি হয়, সন্তানও ক্যান্সার, কিডনীসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়াও স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হচ্ছে। খাদ্যের সক্সেগ বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণের পরে নিঃশেষ না হয়ে দেহের ভিতর দীর্ঘদিন জমা থাকে। ফলে এ বিষক্রিয়া বংশ থেকে বংশে স্থানান্তর হয়।
বিষাক্ত খাদ্যের ভয়াবহতা বিবেচনায় বর্তমান সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও রয়েছে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ১৯৭৪। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সংসদ কর্তৃক সুনিদিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার যথাযথ উদ্যোগ ও অঙ্গীকারের অভাব, বিষাক্ত খাদ্যের ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনুধাবনে ব্যর্থতার ফলে আমরা জনগণ এর কোন সুফল পাচ্ছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধীরে ধীরে আমরা পংঙ্গু জাতিতে পরিণত হব।
সঙ্কট থেকে উত্তরোণে মানববন্ধনে প্রস্তাবিত কিছু করণীয়
১. বিষ ও ভেজালমুক্ত ইফতারি সামগ্রী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন অপরিহার্য। সমন্বিত বাস্তবসম্মত মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম প্রণয়নের লক্ষ্যে বাণিজ্য বা খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুততম সময়ে একটি সভা আহ্বান করতে পারে।
২. খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি মিশানোর সাথে জড়িত ও রাসায়নিক দ্রব্যাদিযুক্ত খাদ্য বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর ২৫-গ ধারা প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই আইনের ২৫-গ ধারায় খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল খাবার বিক্রয়ের জন্য মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রয়েছে।
৩. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।
৪. ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ এবং নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
৫. জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে খাদ্যে বিষ বা ভেজাল রোধে কোন রকম বৈষম্য বা রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই আইন প্রয়োগে সরকারের প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. ভেজাল বিরোধী টিম কর্তৃক নিয়মিতভাবে খেজুরসহ অন্যান্য ফল, মুড়ি, সেমাই, রং মিশ্রিত সকল খাবার, ইত্যাদি পরীক্ষা করা এবং সকল খাদ্য মজুদকারী গুদাম বা কারখানা বা মোকাম পরিদর্শন করা।
৭. পণ্য আমদানি পর্যায়ে এনবিআর কর্তৃক ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যাদি পরীক্ষা করা এবং এ কাজে এনবিআরের সক্ষতা বৃদ্ধি করা।
৮. গণমাধ্যমে প্রচার- প্রচারণার মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ফরমালিন ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যাদির বিষয়ে সচেতন করা।
৯. বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারকে খাদ্যে বিষ মিশ্রণের উৎসমূল থেকে শুরু করে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
১০. সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ রাসায়নিক পদার্থের আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী এবং লেবেল ছাড়া বা মিথ্যা লেবেলের অধীন কীটনাশক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১১. সময়োপযোগী কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা ।

