নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সস্তা শ্রমের কারণে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে বলে যে ধারণা আছে তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট। শ্রমিকদের নৈপুণ্যে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত।
শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্ট্রার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘রানা প্লাজার তিন বছর’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন, সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাঈল শিপার, আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রীনিবাস রেড্ডি, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতা ও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
কারখানা পরিদর্শনে আসা ক্রেতাদের দুই সংগঠন অ্যাকোর্ড এবং অ্যালায়েন্স বাংলাদেশে কতদিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এমন বিতর্কের নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট । তিনি বলেন, অ্যাকোর্ড ও অ্যালায়েন্সের অবদান প্রথম দিকে বুঝা না গেলেও এখন এটার ফল পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছে। তাদের আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
রানা প্লাজার কথা তুলে ধরে বার্নিকাট বলেন, অনেক ভালো কাজ অনেক সময় একটি মাত্র খারাজ কাজের জন্য ঢাকা পড়ে। রানা প্লাজাও ঠিক তেমন একটা ঘটনা। রানা প্লাজার মত একটি খারাপ ঘটনা পুরো খাতকে কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু এর পরও তো অনেক ভালো কারখানা রয়েছে, ভালো পরিবেশে পোশাক তৈরি হচ্ছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে নেদারল্যাল্ডের রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেথ বলেন, বিশ্বে আদর্শিক ও ভালো পোশাক তৈরী কারখানার বেশ কয়েকটি বাংলাদেশে অবস্থিত। তবে বিশ্বব্যপী এটির খুব একটা প্রচারণা নেই। দুর্ঘটনার পর সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে তিনটি বিষয়ের গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত উৎপাদন ব্যবস্থাসহ কারখানার চারপাশের পরিবেশের নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের যে পর্যবেক্ষেণ দুর্বলতা আছে তার উত্তোরণ ঘটাতে হবে।
দ্বিতীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে শ্রমিকদের মালিকানায় অংশিদারিত্ব করতে হবে।
তৃতীয়ত বৈশ্বিক অর্থনীতির ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিয়ে পণ্যের মুল্য সমন্বয় করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক কারখানা থেকে ৫ ডলারের কেনা একটি পণ্য ২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এর মাঝের ২০ ডলার যাচ্ছে কোথায়, তার সমাধান করতে হবে। তা না হলে এ ধরণের সমস্যা সমাধান হবে না।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রানা প্লাজার ঘটনাকে মনে রেখে আগামীতে একটি সুন্দর শিল্প পরিবেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। আর রানা প্লাজার সব ধরণের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিখোঁজ শ্রমিক, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনকর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিকিকরনের প্রতি আমাদের জোর দিতে হবে।
রানা প্লাজার ওপর তৈরি করা পঞ্চম গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ৩ হাজার ৬৩২টি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। তবে এখনো কারখনার একটি বড় অংশ পরিদর্শনের বাইরে রয়েছে। এর সংখ্যা ৯০৯টি।
কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে উন্নতি হচ্ছে উল্লেখ করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, উন্নতি হচ্ছে তবে এটা ধীরগতির। অনেক জায়গায় সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সবজায়গায় সমান তালে আগাচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে মালিকরাও এর বিরোধীতা করে।
উপস্থিত শ্রমিক নেতারা বরাবরের মতই পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তারা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের এ যাবতকালে যতটা অর্থসহযোগিতা দেয়া হয়েছে তার পুরোটাই কোন না কোন ক্রেতা গোষ্ঠী বা সংস্থার অনুদান বা সাহায্য। প্রকৃত অর্থে এখন পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি। এই ক্ষতিপূরণ কার কাছ থেকে কিভাবে আদায় করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ঠ নীতিমালা চায় তারা।
একইসঙ্গে রানা প্লাজা সহ গার্মেন্টস খাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় আহতদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সুচিকিৎসা ও যারা সুস্থ হয়ে উঠেছে তাদের কর্মসংস্থানের দাবি জানান তারা।

