নিজস্ব প্রতিবেদক : ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩ মার্চ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নির্বাচনে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতি ধাপে মাঠে থাকবে দেড় লক্ষাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এছাড়া এবারই প্রথম নির্বাচনী মাঠে ৪ দিনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মেতায়েনের প্রস্তাব রেখেছে ইসি।
ওইদিন শনিবার সকাল ১১টায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকাল ১১টায় এ বৈঠকে শুরু হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অব অফিসার, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবি ও কোস্টগার্ড, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সব বাহিনীর প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত থাকবেন বলে কমিশন সূত্রে জানা যায়।
এ বিষয়ে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ৩ মার্চ ইউপি নির্বাচন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ভোটের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এখানে আমরা বিভিন্ন প্রস্তাবনা রাখবো। পরবর্তীতে বৈঠকে আলোচনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নির্ধারণ করা হবে।’
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এবারেই প্রথম ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চার দিনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে রাখার প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। এতে করে প্রতিটি ধাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় লক্ষাধিক সদস্য নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করবে।
ইউপি নির্বাচন সুষ্টুভাবে করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে প্রাক-নির্বাচনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নির্বাচনপূর্ব শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি, সন্ত্রাসী, মাস্তান ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার, তাদের দৌরাত্ম রোধের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ, বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যক্রম গ্রহণ এবং নির্বাচনী দ্রব্যাদি পরিবহন ও সংরক্ষণের নিরাপত্তা বিধান, নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধিসহ বিভিন্ন নির্দেশনা সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালনের জন্য পরিবেশ তৈরি করা এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা-বিষয়ক কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ। এই বিষয়গুলো বৈঠকে আলোচনার এজেন্ডাভুক্ত করা হয়েছে।
বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ৭৩৮টি ইউপিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রায় ৭ হাজার ভোটকেন্দ্র রয়েছে। প্রথম ধাপের ইউপিসহ প্রতিটি ধাপের নির্বাচনে সাধারণ ভোট কেন্দ্রে পুলিশ ও ১২ জন আনসার মিলে মোট ১৭ জন ফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। আর ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ফোর্স রাখার পরিকল্পনা রয়েছে ১৯ জন করে।
পৌরসভা নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনেও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে কার্যপত্রে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনের সময় র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং সীমিত পরিসরে সেনাবাহিনী ও নৌ-বাহিনীর মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখা হয়েছিলো। তবে এবার ৪ হাজার ২৭৫ টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মোবাইল বা স্ট্রাইকিং ফোর্সের দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ান আনসার, র্যাব, কোস্ট গার্ড ও বর্ডার গার্ড (বিজিবি) মোতায়েন করা যেতে পারে।
এবার পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ান আনসারের সমন্বয়ে প্রতি ধাপে প্রতি ইউনিয়নে ১টি করে ৪ হাজার ২৭৫ টি মোবাইল ফোর্স, প্রতি তিন ইউপির জন্য ১টি করে ১ হাজার ৪২৫ টি স্ট্রাইকিং ফোর্স রাখার প্রস্তাব রেখেছে ইসি।
অন্যদিকে প্রতি উপজেলায় ২টি করে র্যাবের মোবাইল টিম ও ১টি স্ট্রাইকিং টিম এবং প্রতি উপজেলায় ২ প্লাটুন বিজিবি মোবাইল টিম ও ১ প্লাটুন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। আবার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি উপজেলার জন্য কোস্টগার্ডের ২ প্লাটুন মোবাইল ফোর্স ও এক প্লাটুন স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকছে- যারা ভোটের আগের দু’দিন, ভোটের দিন ও পরের দিন অর্থাৎ চারদিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে ভোট কেন্দ্রর বাইরে পুলিশ/র্যাবের টিম নিয়োগ করা যেতে পারে।
এদিকে জেলা প্রশাসক প্রয়োজন মনে করলে ফোর্স পাওয়া সাপেক্ষে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করতে পারবেন। অন্যদিকে প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্রে মেটাল ডিটেক্টর স্থাপনের চিন্তা-ভাবনাও করা হচ্ছে।
আবার জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে মনিটরিং সেল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে ইসির সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়।
এছাড়া বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনিটরিং সেল, ভিজিল্যান্স ও অবজারবেশন সেল টিম গঠন ছাড়াও নির্বাচনে সন্ত্রাস, মাস্তানদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে করণীয় নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে কার্যপত্রে।
নির্বাচনী মাঠে থাকছে নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়ে কার্যপত্রে বলা হয়, ৪ হাজার ২৭৫ ইউপিতে নির্বাচন উপলক্ষে প্রতি উপজেলায় প্রার্থীতা প্রত্যাহারের পরের দিন থেকে ভোট সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ১ জন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভোটের আগের ২ দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের দিন অর্থাৎ এই চার দিনের জন্য ৩ জন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যেতে পারে।
এছাড়া প্রতি উপজেলায় ভোটের আগের ২ দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরের দিন অর্থাৎ এই চার দিনের জন্য ১ জন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা যেতে পারে। সর্বশেষ ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে ভোটের দিন অপরাধ বিচার করার জন্য তাৎক্ষনিক ১ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছেন।
নির্বাচনী এলাকায় সরকারি সুবিধাভোগীদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেন না। সরকারের সুবিধাভোগী বলতে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাদের সমপদমর্যাদা সম্পন্ন কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। ভোটের দিন ওই এলাকার ভোটার হলে ভোট দিয়ে এলাকা ছাড়তে হবে। ভোট গণনার সময় তারা যাতে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে জন্য প্রিজাইডিং অফিসার সর্তক থাকতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে সন্ত্রাসী, মাস্তান ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার এবং তাদের দৌরাত্ম্য রোধে করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবে কমিশন। এছাড়া ভোটকে সামনে রেখে নির্বাচনী এলাকায় অনুমোদিত যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, লাইসেন্সধারী বৈধ অস্ত্র জমা নেয়া এবং ভোটের আগের দিন বহিরাগতদের নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনা থাকবে।
উল্লেখ্য, এবার সারাদেশে সাড়ে ৪ হাজার ইউপিতে ছয় ধাপে নির্বাচন হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ৬৮৪ ইউপিতে ২ মার্চ পর্যরন্ত মনোনয়ন জমার শেষ দিন, ভোট ৩১ মার্চ। এর পরে যথাক্রমে চার ধাপে ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, ৭ মে ৭২৮টি, ২৮ মে ৭১৪টি এবং ৪ জুন ৬৬০টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

