নিজস্ব প্রতিবেদক : জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা বন্ধে কার্যকর কৌশল নিয়ে এগোতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নজরদারি বাড়ানোর দাবি করা হলেও থামছে না জঙ্গি হামলা। অবশ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু হামলা হলেও শক্তিশালী হতে পারছে না জঙ্গিরা।
গত কয়েক মাসে ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশি হত্যা, পাবনায় গির্জার যাজককে হত্যার চেষ্টা, পুরান ঢাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলা এবং সর্বশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে মন্দিরের পুরোহিতকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এ ছাড়া একের পর এক ব্লগার হত্যার ঘটনাও রয়েছে আলোচনায়। নৃশংস এসব হত্যা ও হত্যা চেষ্টায় দু’একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হোতাদের চিহ্নিত করা যায়নি।
একইসঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ দুই জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ, আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের গোপন আস্তানার সন্ধান পায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গোপন ওই দুই আস্তানায় অভিযানে গ্রেনেডসহ শক্তিশালী বিস্ফোরকও উদ্ধার করা হয়।
দু’আস্তানায় অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় জঙ্গিরা। যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরের গোপন আস্তানায় অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলা হয়।
জঙ্গিদের গোপন আস্তানায় অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জনবহুল এলাকায় গোপন আস্তানা গড়ে তুলছে জঙ্গিরা। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণ শিবির, বিস্ফোরক তৈরির আয়োজনও পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে জঙ্গি সংগঠনের পরিকল্পনা ও কৌশলের কাছে পিছিয়ে থাকছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
রাজধানী ঢাকার আশপাশে নিম্নবিত্তের বসবাস এবং ভাড়া কম এরকম এলাকায় জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের অবস্থানের জন্য বেছে নিচ্ছে। ঢাকার এসব এলাকায় মধ্যে রয়েছে মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর, আশকোনা, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডার নিম্নাঞ্চল।
এসব এলাকায় আনসারুল্লাহ বাংলাটিম (এবিটি), জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ (হুজি) সহ জঙ্গি সংগঠনগুলো আস্তানা পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সম্প্রতি ডিবি ও র্যাব এসব এলাকায় বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।এর আগে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে দেশব্যাপী জেএমবির জঙ্গি কার্যক্রমের সময়ও রাজধানীর চারদিকের নিম্নাঞ্চলে জঙ্গিদের আস্তানার সন্ধান মিলেছিল।
শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর সাঁতারকুল ও মোহাম্মদপুরে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অভিযান চালিয়ে হ্যান্ড গ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে। এই অভিযানে কামাল ওরফে শাহীন (২৬) ও শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিন (৩০) নামে দুই এবিটি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে কামাল জানায়, বাড্ডায় তাদের হেড অফিস এবং অপর জঙ্গি শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিন মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে থাকে, যেখানে তাদের বোমা তৈরির কারখানা। বাসাটি দুই মাস আগে ভাড়া নিয়েছিল তারা।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর মিরপুরের ১ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাড়িতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড উদ্ধার করে। ওই বাসা থেকে জেএমবির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, কার্যক্রম চালাতে অনেকটা নিরিবিলি এলাকা পছন্দ তাদের। নিরিবিলি এলাকায় বাসা ভাড়া নিলে কেউ সন্দেহ করে না। কয়েক মাস পর বাসা পরিবর্তন করে নতুন আস্তানা গড়ে তোলা যায়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিরা জানিয়েছে, বর্তমান সরকার উৎখাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এ জন্য রাজধানীর দক্ষিণ ও উত্তরের নিম্নাঞ্চল যথাক্রমে যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। ভারতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য পশ্চিমবঙ্গে খোলা হয়েছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
কিন্তু এসব জঙ্গি গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে পারেনি। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের মামলায় আদালতে দাখিল করা সম্পূরক চার্জশিটে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এলাকায় জঙ্গি সংগঠনগুলো বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করে। বাসা ভাড়া কম এবং নিম্নবিত্তের বসবাস করা এলাকা বেছে নেয় তারা।’
র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও ডিএমপি’র কাউন্টার টেরিজম ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, মিরপুরের নিম্নাঞ্চল, পল্লবী, মিরপুরের শাহআলী, গড়ান চটবাড়ি, মাজাররোড, তুরাগ, আশকোনা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, সাঁতারকুল, বাড্ডা, খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, সারুলিয়া, রায়েরবাগ, মীর হাজীরবাগ, লালবাগের বেরিবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, কামরাঙীরচর, রায়েরবাজারসহ অন্তত অর্ধশত এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের আস্তানা থাকতে পারে।
এর মধ্যে মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর ও আশকোনা এলাকার জঙ্গিদের আস্তানাগুলো শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেরিজম ইউনিট ও র্যাব।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘লোকচক্ষুর আড়ালে জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের বাসিন্দারা যেন সন্দেহ করতে না পারে, এমন জায়গা তারা বেছে নেয়। তবে জঙ্গি কার্যক্রমের জন্য রাজধানীর চারদিকে অবস্থান করতে হবে এমন বিষয়টি ঠিক নয়। এর জন্য যেখানে নিরিবিলি এবং নিরাপদ সেখানে জঙ্গিরা অবস্থান করে।’
‘জঙ্গিদের শীর্ষ নেতারা কারাগারে বন্দি রয়েছে। কারাগারের বাইরে অবস্থানরত সদস্যরাই নিজেদের জানান দেয়ার জন্য এ ধরনের জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে আগের মতো জঙ্গিদের শক্তিশালী কার্যক্রম নেই,’ বলেন তিনি।

