ঢাকাFriday , 19 February 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাইসমিলের ছাই-ধোঁয়াতে পরিবেশ দূষিত

Link Copied!

air-polutionকুষ্টিয়া প্রতিনিধি : অপরিকল্পিত রাইস মিল ও চাতালের ধোঁয়া, বর্জ্য, ধুলো-ময়লা, তুষ-ছাই উড়ে আবাসিক বসতবাড়িতে পড়ে একদিকে যেমন এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে মিল গড়ে তোলায় দুর্ঘটনায় মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা আহত ও নিহতের ঘটনা ঘটছে।

কুষ্টিয়ার খাজানগরে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে মিল-কলকারখানা। বাংলাদেশে চালের প্রসিদ্ধ খাজানগর, আইলচারা, কবুরহাট। চালের চাহিদার কারণেই এখানে গড়ে উঠেছে অনেক অটো রাইসমিল ও ধান চাতাল।

সূত্রমতে, চাল উৎপাদনের বৃহৎ শিল্পনগরী কুষ্টিয়ার খাজানগর, কবুরহাট, আইলচারা, বল্লভপুরে প্রায় ৫০টি বড় অটোরাইস মিলসহ ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৬শ’টি রাইস মিল গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি ধান সিদ্ধ-শুকানোসহ নানা প্রক্রিয়ার জন্য চাতালও রয়েছে দুই সহস্রাধিক। সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়। এখানকার উৎপাদিত চাউলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে রপ্তানি করা হয়।

চালের চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় মিলাররা ও ব্যবসায়ীরা চাল উৎপাদনে যেমন আগ্রহী হয়ে উঠেছে তেমনি দিন দিন বেড়েই চলেছে অটোরাইস মিলের সংখ্যা। কিন্তু অটোরাইস মিল বাড়লেও তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে না।

খাজানগরের মিল সংলগ্ন ছোট ছোট ব্যাবসয়ী ও কয়েকটি পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন, মিলের ধোঁয়া, ছাই ও তুষ উড়ে তাদের বসবাসের অবস্থা নেই। আবাসিক এলাকার মধ্যে এসব মিল গড়ে উঠায় সব সময় ছাই উড়ে তাদের ঘরবাড়ি অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে টিনের ঘর বসতবাড়িসহ গাছ-পালা। এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এসব ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে এসব এলাকার পরিবারগুলোতে চোখের রোগ, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ হচ্ছে।

মিলের ধোঁয়া ও ছাই উড়া বন্ধে নির্দিষ্ট পরিমাণ উঁচু চিমনি ব্যবহার এবং মিলের নিচের দিকে হাওয়ার সাহায্যে ছাই এবং তুষ একস্থানে স্তুপ করা যায়। কিন্তু এটি তৈরি করতে বাড়তি ব্যয় হওয়ায় মিল মালিকরা এটি স্থাপন না করায় মিলে ছাই তুষ উড়ে পরিবেশ দূষিত হয়। চাতালগুলোতেও জ্বালানি তুষ ব্যবহারের জন্য চিমনি তৈরি করলে এসব ছাই বাইরে উড়ে পড়ে না বলে অনেক মিলাররাও জানায়।

কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে মিল গড়ে না উঠায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকাবাসী। এছাড়াও অপরিকল্পিতভাবে ছাইয়ের গাদার ওপর বিল্ডিং স্থাপন করায় দেয়াল ধসে মানুষের জানমালের চরম ক্ষতি হচ্ছে। কয়েক বছরে মারা গেছে বেশ কয়েকজন। মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট পোশাক ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও খাজানগর আইলচারার কোনো মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের পোশাক ব্যবহার করানো হয় না। ফলে মিলে ধুলো-ময়লা, ধোঁয়া সহজেই শ্রমিক-কর্মচারীদের দেহে প্রবেশ করে অ্যাজমা রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরিতে বৈষম্য থাকলেও চাতালগুলোতে নারীরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাত্রীযাপনের জন্য আবাসন না থাকায় মিলের ধুলো-ময়লার মধ্যে রাত কাটানোর কারণে তারাও বিভিন্ন রোগে ভুগছেন।

এদিকে পরিকল্পিতভাবে মিল গড়ে তোলার দাবিতে বেশ কয়েকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে এলাকার লোকজন। তাদের দাবি মিলগুলোতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চিমনি ব্যবহারসহ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে ছাই উড়া বন্ধ করতে হবে।

এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট শ্রম বিভাগ ও পরিবেশ বিভাগ থাকলেও তাদের কোনো তদারকি নেই এখানে। ফলে কুষ্টিয়ার খাজানগর আইলচারার মিল মালিকরা তাদের ইচ্ছেমতো মিলগুলো স্থাপন ও পরিচালনা করছেন। এতে জনসাধারণ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আব্দুস সালাম নামে এক মৎস্যচাষী বলেন, ‘জলাশয় ও নদীতে কালো পানি ও ছাই গিয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। পানি দূষণের ফলে পুকুরের মাছ মরে যাচ্ছে।’

আব্দুল করিম নামের এক কৃষক বলেন, ‘বিষাক্ত ছাইয়ের কারণে জমিতে ফসল হচ্ছে না। সর্বশান্ত হচ্ছেন কৃষক, সবুজ ফলের গাছ মারা যাচ্ছে।

এদিকে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানাবো।’

গবেষক ও পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় বলেন, ‘ক্রমাগত বিষাক্ত ছাই ও কালো ধোঁয়া বাতাসে উড়তে থাকলে জমিতে ক্ষারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, আর বাতাসের ক্ষেত্রে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। জমির পুষ্টি উৎপাদন হ্রাস পায় এবং এক সময়ে মাছ-পশু পাখি মারা যায়। এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।

কুষ্টিয়া মেজর অটো রাইস অ্যান্ড হাস্কিং মিলের সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, ‘রাতে কোনো ছাই বাতাসে উড়ানো হয় না। নিয়ম মাফিক ছাই নির্গমণ করা হয়। আর পুকুর-জলাশয়, জমি ইত্যাদিতে দেয়ার জন্য মানুষ এই এলাকা থেকে প্রতিদিন ছাই নিয়ে যায়। তবে কোথায় যায় তা জানা নেই তাদের।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মানবদেহের জন্য এই বিষাক্ত ধোঁয়া ও বাতাসে উড়ন্ত ছাইয়ের কারণে শিশুসহ সব বয়সী মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ হতে পারে।’

কুষ্টিয়ায় পরিবেশ নিয়ে কাজ করা আরও কয়েকজন বলেন, ‘চাতালগুলির যত্রতত্র অবস্থান কালো ধোঁয়ায় চরমভাবে পরিবেশ ও মানবাধীকার লঙ্ঘন হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নির্গত কালো ধোঁয়ার প্রভাবে ক্ষেতের ফসল উৎপাদন কমে গেছে। পশু-পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জনবসতি এলাকা হওয়ায় নির্গত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

তারা আরো বলেন, ‘মিলের ধোঁয়া ও ছাই উড়া বন্ধে নির্দিষ্ট পরিমাণ উঁচু চিমনি ব্যবহারের কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।’ তিনি অবিলম্বে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ পরিবেশ দূষণ কঠোরভাবে হস্তক্ষেপের দাবি জানান।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ পরিবেশ ও জলবায়ু বান্ধবের জন্য পুরস্কৃত হয়েছে। সেখানে কুষ্টিয়ার এ সব রাইস মিলগুলো দিনের পর দিন বাতাসে ছাই উড়িয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে। তা রোধ করার কেউ নেই। এমন চরম অমানবিক কাজের জন্য ওই সকল মিল মালিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এলাকাবাসীর।