কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি উপজেলার ভূমি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রার আছেন মাত্র একজন। মিরপুর উপজেলার ওই কর্মকর্তাকে আবার সপ্তাহে তিনদিন মাগুরা জেলায় গিয়ে কাজ করতে হয়। এই কারণে যারা ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসেন তারা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
এখানে মাসের পর মাস চলে যায় কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি করতে পারেন না তারা। আর এই সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো তৎপরতাও চোখে পড়ে না।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কমলাপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক এনামুল হক। তিনি পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন পৈতৃক সম্পত্তির বণ্টননামা রেজিস্ট্রি দলিল করতে। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, অফিস ভবনের সবকিছুই আছে ঠিকঠাক। খোলা আছে প্রধান ফটক, মূল ভবনের দরজা-জানালা। সাজানো আছে চেয়ার টেবিল, এজলাস, নথিপত্র, উপস্থিত আছেন কেরানি-পিয়ন। নেই শুধু এই কার্যালয়ের কর্মাকাণ্ডের প্রধান সাব-রেজিস্ট্রার মহোদয়।
ঢাকাতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উপজেলার বারখাদা গ্রামের আজিম উদ্দিন আহমেদ জানান, অনেক চেষ্টা করে দুদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি করার জন্য বায়নাকৃত একখণ্ড জমি রেজিস্ট্রি করতে এখানে এসেছিলেন। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় সেটা আর সম্ভব হলো না। অফিসের ছুটিও নাই তাই যে কাজে আসা তা না করেই ফিরতে হচ্ছে তাকে।
তিনি আরো জানান, সরকারের সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রাপ্তির এই ক্ষেত্রটি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এখানে আগত রাজস্বদাতা জনগণ পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় সেবা।
কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ছয়টি উপজেলার ২২ লাখ জনগণের ভূমি রেজিস্ট্রির কাজ করতে প্রত্যেক উপজেলাতেই সাব-রেজিস্ট্রি দপ্তর আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পদশূন্যতায় নেই দপ্তর কর্মকর্তা সাব-রেজিস্ট্রার। একজন বা দুজন সাব-রেজিস্ট্রারকে দিয়ে সবগুলো উপজেলায় সপ্তাহের কর্মদিবস ভাগ করে কোনোমতে কাজ চালিয়ে নেয়া হয়। ফলে এখানে আগত জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অথচ সরকারের রাজস্ব আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত এই রেজিস্ট্রি অফিসের প্রতি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রয়েছে চরম উদাসীনতা।
কুষ্টিয়া জেলার ভূমি রেজিস্ট্রি খাত থেকে বার্ষিক প্রায় শতকোটি টাকা অর্জন সম্ভব হলেও সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় এই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।
কুষ্টিয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এখন প্রতিদিন হাত গুটিয়ে বসে বসে চা খেয়ে আর পত্রিকা পড়ে দিন পার করছি। দলিল রেজিস্ট্রি না থাকলে তো কোনো কাজই এখানে হয় না। এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা এসে ফিরে যাচ্ছেন। কিছুই করার নেই।’
দলিল লেখক সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন জানান, সদর উপজেলার আলামপুর গ্রামের কৃষক আমির উদ্দিন তার স্ত্রীর চিকিৎসার প্রয়োজনে জমি বিক্রির জন্য এসেছিলেন। সাত-আট দিন ধরে ঘুরে ঘুরে ফিরে গেছেন। তিনি জমিও রেজিস্ট্রি দিতে পারেননি, টাকাও জোগাড় করতে পারেননি।
এ ব্যাপারে জেলা রেজিস্ট্রার শামীমা সুলতানা মুঠোফোনে বলেন, ‘কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলার জন্য এখন মাত্র একজন সাব-রেজিস্ট্রার রয়েছেন। মিরপুর উপজেলার ওই কর্মকর্তাকে সপ্তাহে তিনদিন মাগুরা জেলায় গিয়ে কাজ করতে হয়। আবার নিজ উপজেলার কাজও সারতে হয়। এই অবস্থায় জেলাজুড়ে জমি রেজিস্ট্রির কাজ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। প্রতিদিনই এখানে আগত জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের। পরিস্থিতি উত্তরণে শূন্যপদগুলো পূরণ করতে মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) ও আইনসচিব বরাবর বারংবার চাহিদাপত্র দেয়ার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘দেশের কিছু কিছু রেজিস্ট্রি অফিসে পোস্টিং পেতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় দিনের পর দিন ভিড় জমান মোটা অঙ্কের টাকার ব্যাগ হাতে করে অনেক সাব-রেজিস্ট্রার। অথচ কুষ্টিয়া জেলায় কেউ আসতে চান না বলেই এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) আবদুল মান্নানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

