নিজস্ব প্রতিবেদক : সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বইমেলা জনস্রোতে ভাসবে- এমন কথা আগেভাগেই বলেছিলেন লেখক-প্রকাশকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। সে কথা মিথ্যে হলো না। বেলা ১১টায় বইমেলা আনুষ্ঠানিক শুরু কথা থাকলেও সকাল থেকেই মেলাপ্রাঙ্গণ ছিল মানুষের পদভারে মুখর। দুপুর ৩টায় গিয়েও দেখা গেল একই চিত্র। টিএসসি থেকে বইমেলার গেইট পর্যন্ত লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সব বয়সের মানুষেরা।
তল্লাশি করে তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ভেতরে গিয়েও দেখা গেল, স্টলগুলোর সামনে ভিড়। তারা বই দেখছেন, কিনছেন। এক কথায়, প্রথম ছুটির দিনেই বইমেলা ফিরে পেল প্রাণ।
ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে এসেছিলেন বইমেলায়। নরসিংদী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মেলায় এসেছিলেন ২৪ জন শিক্ষার্থী। মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে তারা প্রিয় লেখকের বই কিনেছেন। নতুন কী বই কিনলেন, জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মাসুদ রানার বই ছাড়াও কবিতার বই কিনেছি।’
মেলার এই ভিড় হাসি ফুটিয়েছে প্রকাশকদের মুখেও। সময় প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আজই প্রথম স্টলে এলাম। এখন থেকে মেলা যত দিন যাবে ততই ভিড় বাড়বে। আজকের মেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, সবচাইতে বেশি বই প্রকাশ হয়েছে আজ। বৃহৎ পরিসরে ও খোলামেলাভাবে মেলা হওয়ায় এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কারণে সেটার সুফল পাঠকরাও ভোগ করছে।
তবে শুক্রবার মেলাপ্রাঙ্গণ ছিল ধূলিধূসর। মানুষের পায়ে পায়ে ধুলো উড়ে বাতাস ছিল ভারী। অনেককেই মাস্ক পরা দেখা গেছে। মেলা প্রাঙ্গণে যে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ছিটানো হয়নি, সে অভিযোগ করেছেন মেলায় আগত দর্শনার্থীরা। তবে ধুলো মাড়িয়ে সবাই ছুটে গেছেন পছন্দের বইটি কিনতে। বিক্রিবাট্টাও ছিল খুব। আর সে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন স্টলের বিক্রয়কর্মী ও প্রকাশকেরা।
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি পুরো মেলাপ্রাঙ্গণের ভেতর-বাহির পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন।
নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মেলার নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি আছে কি না সেটা দেখার জন্য আমি এসেছি। পুরো মেলাপ্রাঙ্গণে মোট ৭টি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। দুরবীণ দিয়ে তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব ভিডিও ফুটেজে প্রত্যেক দর্শনার্থীর আগমন-নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
গতবছর বইমেলায় ২৬তম দিনে বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায় হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান বলেন, ‘গতবছরের দুঃখজনক অভিজ্ঞতার আলোকে এবার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। আর যেন কোনো দুঃখজনক ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।’
দেশের সম্মান রক্ষার্থে জনসাধারণকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
বিকেল ৫টার দিকে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতবছর সেতুমন্ত্রীর একটি উপন্যাস বেরিয়েছিল বইমেলায়। এবার বেরিয়েছে তার সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে একটি বই ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’।
চারুলিপি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে এ বই। আর শুক্রবার সেখানেই আসেন তিনি। স্টলের ভেতর বসেন। তার বইয়ের ক্রেতাদের অটোগ্রাফ দেন।
নতুন বই সম্পর্কে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘এ বই নতুন নয়। পুরনো লেখার নতুন মুখ। আমি যখন সাংবাদিক ছিলাম তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখতাম। ওগুলোরই একটি সংকলন এ বই।’
আগামী বছর তার নতুন উপন্যাস আসছে বলে জানান সেতুমন্ত্রী। তবে চমক রাখার জন্য নাম প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, ‘পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবন নিয়ে লিখছি। আজও (শুক্রবার) এক পৃষ্ঠা লিখেছি। পদ্মাপাড়ের মানুষের ভাঙা-গড়ার জীবনই ওই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।’
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসেছিল শিশু-কিশোর মেলা। তাদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। রংপেন্সিলে শহীদ মিনার, ফুল-ফল-প্রকৃতি ছবি মনের মাধুরি মিশিয়ে আঁকে তারা। বেলা ১১ থেকে ১টা পর্যন্ত এ শিশুপ্রহরে শিশুরা আনন্দে মেতে ওঠে। তিন বিভাগে (ক, খ ও গ) অংশ নেয় প্রায় হাজারখানেক শিশু-কিশোর। শিশুরা ঢুঁ মারে স্টলগুলোতে। সেখানে তারা বই দেখে। তাদের বই কিনে দেন অভিভাবকেরা।
শিশুদের জন্য বাংলা একাডেমি এবার বেশ কয়েকটি নতুন বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি ছোটদের অভিধান-এর নতুন সংস্করণ, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সম্পাদিত ‘আমার প্রথম লেখা’, আখতার হুসেন সম্পাদিত ‘হাবীবুর রহমান কিশোর রচনাসংগ্রহ’, সৈয়দ শামসুল হকের বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা বইয়ের সাধারণ ও ব্রেইল সংস্করণ, আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, বেবী মওদুদের ‘রাসেলের গল্প’, শাহজাহান কিবরিয়ার ‘আফ্রিকার রূপকথা’ এবং ‘চালাক শিয়াল ও বোকা শিয়াল’।
নতুন বই : বাংলাএকাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় নতুন ২৫৬টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৪০, উপন্যাস ৪৯, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৬৪, গবেষণা ৪, ছড়া ৮, শিশুসাহিত্য ১৩, জীবনী ৮, মুক্তিযুদ্ধ ৪, নাটক ১, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ৪, ইতিহাস ৫, রাজনীতি ৪, কম্পিউটার ১, ধর্মীয় ২, অনুবাদ ১, অভিধান ৫, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ২ এবং অন্যান্য বিষয়ে ৩০টি।
এর মধ্যে রয়েছে এমিরেটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’ ময়ূরপঙ্খি ও ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ আগামী; নির্মলেন্দু গুণের ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’, কবি প্রকাশন; ড. সনজীদা খাতুনের ‘প্রভাতবেলার মেঘ ও রোদ্র’, নবযুগ প্রকাশনী; আবুল আহসান চৌধুরীর ‘অন্নদাশঙ্কর রায় : মন=মননের পত্রালি’, পলল প্রকাশনী; মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘যখনি জাগিবে তুমি’, আফসার ব্রাদার্স; শামসুজ্জামান খানের ‘নিষ্ঠুর রাজা ও দশ ভাই’ ও সেলিনা হোসেনের ‘যখন বৃষ্টি নামে’, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ; ইমদাদুল হক মিলনের ‘রেশমি’, অনন্যা; মোরশেদ সফিউল হাসানের ‘ছোটদের গ্যালিলিও’ ও ‘জানার মধ্যে কত মজা’, আন্দালিব রাশদীর ‘ট্যারা মাখনার নোবেল প্রাইজ; কথা প্রকাশ; রকিব হাসানের ‘কিশোর মুসা রবিন : সাগরে আতঙ্ক’ ও আহসান হাবীবের ‘কেঁচো খুড়তে অ্যানাকোন্ডা, অক্ষর প্রকাশনী; হাসান হাফিজের ‘আট দেশের রূপকথা’, ঝিঙেফুল; আনিসুল হকের ‘লিফটে আটকে পড়া যুবক যুবতীরা’ ও পিয়াস মজিদের ‘কবিকে নিয়ে কবিতা’, সময় প্রকাশনা; সুমন্ত আসলামের ‘হঠাৎ তোমার জন্য’, কাকলী প্রকাশনী; শুভাশিষ সিনহার ’আবছায়াদের রূপকথা’, ঐতিহ্য; পলাশ মাহবুবের ’মা করেছে বারণ’, ঐতিহ্য; শাহরিয়ারের ‘কল্পশিকারী’।
মূল মঞ্চের আয়োজন : বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আহমদ কবির। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর পরিচালনায় ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল লতিফ শাহ্, শফি মণ্ডল, রণজিৎ দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, ভজন কুমার ব্যাধ ও কোহিনুর আকতার গোলাপী।
শনিবার মূল মঞ্চের আয়োজন : শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়। চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুদের অভিভাবকসহ স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে। সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশুকিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার
প্রাথমিক বাছাই। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : ফোকলোর কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. ফিরোজ মাহমুদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অসীমানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, শাহিদা খাতুন, নন্দলাল শর্মা এবং সাইফুদ্দীন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। এ ছাড়া সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

